মোঃ মাইন উদ্দিন :
কৃষকের জমি শুধু কয়েক শতক মাটি নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবারের জীবিকা, সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং খাদ্য উৎপাদনের নিরাপত্তা। অথচ কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার ফরিদপুর ইউনিয়নের নাপিতেরচর এলাকায় কৃষিজমির মাটি কেটে নেওয়ার অভিযোগ যেন কোনোভাবেই থামছে না। প্রশাসনের অভিযান হয়েছে, কয়েকজনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে, মাটি কাটার যন্ত্রপাতিসহ ট্রাক্টরও জব্দ হয়েছে।
তারপরও যদি একই এলাকায় আবার মাটি কাটা চলে, তাহলে বিষয়টি শুধু অবৈধ মাটি উত্তোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, প্রশাসনিক নজরদারি ও আইনের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পুরোনো ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ের সরকারি খাসজমি এবং আশপাশের কৃষিজমি থেকে দীর্ঘদিন ধরে একটি চক্র মাটি কেটে নিচ্ছে। এর আগেও এ নিয়ে স্থানীয়ভাবে মানববন্ধন এবং প্রতিবাদ সভাও হয়েছে। মানববন্ধন ও সভা পর স্থানীয় প্রশাসন জরিমানাও করেছিল। সর্বশেষ দ্বিতীয় দফা প্রশাসনের অভিযানে পাঁচজনকে আটক করে তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেয় এবং একটি ভেকু ও চারটি ট্রাক্টর জব্দ করে। কিন্তু এ অভিযানের পরও যদি মাটি কাটা বন্ধ না হয়ে নতুন কৌশলে চলতে থাকে, তাহলে প্রশ্ন হলো, শুধু ঘটনাস্থলে থাকা শ্রমিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াই কি যথেষ্ট?
আইন কিন্তু এ ক্ষেত্রে বেশ স্পষ্ট। বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০-এর ২০২৩ সালের সংশোধনে ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি থেকে উর্বর কৃষিজমি, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে কিংবা কৃষিজমির উর্বর উপরিভাগের মাটি নষ্ট করে মাটি উত্তোলন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পরিবেশ, প্রতিবেশ বা জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হয় এমন মাটি উত্তোলনও নিষিদ্ধ।
অন্যদিকে ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩-এর ১৩ ধারায় জেলা প্রশাসকের অনুমতি ছাড়া আবাদযোগ্য বা কর্ষণীয় জমির উপরি-স্তর কর্তনকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এ অপরাধে অনধিক দুই বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। একই আইনের ১৪ ধারায় বেআইনিভাবে ভরাট করা মাটি বা বালু অপসারণ এবং ভূমিকে আগের শ্রেণি বা প্রকৃতিতে ফিরিয়ে আনার জন্য ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতাও জেলা প্রশাসককে দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ আইন শুধু অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার কথা বলে থেমে থাকেনি, ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি পুনরুদ্ধারের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। এ আইন অনুযায়ী নাপিতেরচরের ঘটনা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি কৃষিজমির উপরিভাগের উর্বর মাটি কেটে নিয়ে গেলে শুধু তাৎক্ষণিকভাবে জমির আকৃতি বদলায় না, দীর্ঘমেয়াদে তার উৎপাদনক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
প্রচারিত তথ্য মতে, আগে রাতের আঁধারে ভেকু দিয়ে মাটি কাটা হলেও এখন দিনের বেলায় শ্রমিক নামিয়ে কোদাল দিয়ে মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে। পরে ট্রাক্টর ও ট্রলিতে করে সেই মাটি বিভিন্ন স্থানে নেওয়া হচ্ছে। স্থানীয়দের কেউ কেউ ‘দিপা এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি ইটভাটায় মাটি নেওয়ার কথা বলছেন। তবে এখানেই তদন্তের প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি। কারণ মাটি কাটার স্থানে একজন শ্রমিককে পাওয়া গেলেই যদি অভিযান শেষ হয়ে যায়, তাহলে মূল প্রশ্নটি অমীমাংসিত থেকে যায়। কে মাটি কাটার নির্দেশ দিচ্ছে, কে অর্থ দিচ্ছে, কারা পরিবহন করছে, মাটি কোথায় যাচ্ছে এবং এই পুরো প্রক্রিয়া থেকে কারা লাভবান হচ্ছে, তা খুঁজে দেখা দরকার।
বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইনেও অবৈধভাবে মাটি উত্তোলনের ক্ষেত্রে শুধু ব্যক্তিকে শাস্তির কথা বলা হয়নি, আইন লঙ্ঘনকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট নির্বাহী ব্যক্তিবর্গ এবং সহায়তাকারীদেরও আইনের আওতায় আনার বিধান রয়েছে। অপরাধ প্রমাণিত হলে কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ডের পাশাপাশি অপরাধে ব্যবহৃত ড্রেজার, মাটিবাহী যানবাহন ও সংশ্লিষ্ট সামগ্রী বাজেয়াপ্ত করার বিধানও রয়েছে।
তাই নাপিতেরচরের ঘটনা এক দিনের অভিযান নয়, প্রয়োজন ধারাবাহিক ব্যবস্থা। দিনের বেলায় কোদাল আর রাতের বেলায় ভেকু- কৌশল বদলালেই যেন আইন প্রয়োগের ধরন বদলে না যায়। নিয়মিত নজরদারি, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে পুনরায় অভিযান এবং অভিযোগের উৎস থেকে মাটির গন্তব্য পর্যন্ত পুরো বিষয়টি তদন্ত করা জরুরি।
আর যদি কোথাও অবৈধভাবে মাটি কেটে কৃষিজমির ক্ষতি করা হয়ে থাকে, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত জমি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার বিষয়টিও বিবেচনায় আসতে হবে। কারণ কৃষকের জমি কেটে নিয়ে শুধু জরিমানা বা কারাদণ্ড দিয়ে দায়িত্ব শেষ করলে ক্ষতির পুরো প্রতিকার হয় না। আইনেও ভূমির পূর্বাবস্থা পুনরুদ্ধারের সুযোগ রাখা হয়েছে।
প্রশাসনের অভিযান তখনই সফল হবে, যখন অভিযানের পর একই জমিতে আবার ভেকু নামবে না, শ্রমিক দিয়ে মাটি কাটা হবে না। কৃষকের জমি রক্ষায় স্থানীয় প্রশাসন, ভূমি প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত নজরদারি প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযোগের নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।
কৃষিজমি রক্ষা করা মানে শুধু একজন কৃষককে রক্ষা করা নয়, এটি খাদ্য উৎপাদন, পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার রক্ষা করা। নাপিতেরচরের কৃষকের জমি যদি প্রশাসনের চোখের সামনে বারবার কাটা যায়, তাহলে আইন থাকার পরও তার প্রয়োগ নিয়ে মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হবে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুবই সরল- প্রশাসনের অভিযান, কারাদণ্ড, যন্ত্রপাতি ও যানবাহন জব্দের পরও যদি কৃষকের ফসলি জমি নিরাপদ না থাকে, তাহলে নাপিতেরচরের অসহায় কৃষকের জমি রক্ষা করবে কে?