ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাসিরনগর উপজেলায় যৌতুকের দাবিতে গৃহবধূ সাদিয়া আক্তার মাহি (২২) কে হত্যার অভিযোগে ৮ মাস পেরিয়ে গেলেও ন্যায়বিচার না পাওয়ায় মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে নিহতের পরিবার ও এলাকাবাসী।
বুধবার (৪ নভেম্বর) দুপুর ১২টায় নাসিরনগর উপজেলা সদরের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরে ঘণ্টাব্যাপী এই মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এতে নিহতের পরিবারের সদস্য, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, শিক্ষার্থী, নারী নেত্রী ও সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ অংশ নেন। মানববন্ধনে হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও ফাঁসির দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেন তারা।
পরিবার ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, প্রায় তিন বছর আগে নাসিরনগর উপজেলার চাপরতলা ইউনিয়নের খান্দুরা গ্রামের আব্দুল করিমের ছেলে আলী আহমদের সাথে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয় হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর উপজেলার পিয়াইম গ্রামের দিয়ারিশ মিয়ার মেয়ে সাদিয়া আক্তার মাহির।
নিহতের পরিবারের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই মোটা অঙ্কের যৌতুকের দাবিতে স্বামী আলী আহমদ ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন মাহির উপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে আসছিল। যৌতুক দিতে অস্বীকৃতি জানালে নির্যাতনের মাত্রা আরও বেড়ে যায়।
এরই ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ১১টার দিকে খান্দুরা গ্রামে তার শ্বশুরবাড়ি থেকে সাদিয়া আক্তার মাহির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
পরিবারের দাবি, তাকে শ্বাসরোধ করে মুখে বিষ ঢেলে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে এবং হত্যাকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
এ ঘটনায় নিহতের বাবা দিয়ারিশ মিয়া বাদী হয়ে গত ১ মার্চ নাসিরনগর থানায় স্বামী আলী আহমদসহ ১২ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
পরিবারের অভিযোগ, মামলা দায়েরের ৮ মাস পেরিয়ে গেলেও পুলিশ মাত্র একজনকে গ্রেপ্তার করেছে। মূল আসামি স্বামীসহ অন্যরা এখনও প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
এদিকে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নাসিরনগর থানার এসআই সুমন দাস তদন্ত শেষে আদালতে যে ফাইনাল রিপোর্ট জমা দিয়েছেন, সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে - মাহিকে হত্যা করা হয়নি, সে অসুস্থ হয়ে মারা গেছে। এই রিপোর্টকে 'পক্ষপাতদুষ্ট ও মনগড়া' আখ্যা দিয়ে প্রত্যাখ্যান করেছে নিহতের পরিবার।
মানববন্ধনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিহতের বাবা দিয়ারিশ মিয়া বলেন, "আমার সরল-সোজা মেয়েটাকে বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের জন্য অত্যাচার করতো ওরা। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি সবাই মিলে আমার মেয়েটাকে মেরে ফেলেছে। ৮ মাস ধরে থানায় ঘুরছি, কিন্তু আসামিদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না।"
তিনি আরও অভিযোগ করে বলেন, "আসামিদের গ্রেপ্তারের কথা বললে এসআই সুমন দাস বলেন - সব মামলার আসামিকে গ্রেপ্তার করা যায় না। এমনকি তিনি বলেন, আসামির টাকায় আমার সংসার চলে। একজন পুলিশ কর্মকর্তার মুখে এমন কথা কিভাবে আসে?"
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই সুমন দাস বলেন, "আসামির টাকায় সংসার চলে এমন কোনো মন্তব্য আমি করিনি। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে যা এসেছে, আমি তার ভিত্তিতেই প্রতিবেদন দিয়েছি। রিপোর্টে ভুল কিছু লেখা হয়নি।"
নাসিরনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহিনুল ইসলাম বলেন, "আমরা পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্ত করেই রিপোর্ট দিয়েছি। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে হত্যার কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। আসামির টাকায় পুলিশের সংসার চলে, এই অভিযোগটি সম্পূর্ণ অবাস্তব ও ভিত্তিহীন।"
এদিকে এলাকাবাসী ও মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা অবিলম্বে ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পুনঃতদন্ত, মামলাটি পিবিআইতে হস্তান্তর এবং মূল আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।