শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কবে? বলাৎকারসহ শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের খবর যখন একের পর এক সংবাদমাধ্যমে আসে, তখন বিবেকবান মানুষের মনে এ প্রশ্নটিই ঘুরপাক খায়। একটি শিশুর নিরাপদ শৈশব যেখানে তার মৌলিক অধিকার, সেখানে বারবার এমন অপরাধের ঘটনা আমাদের সমাজ, পরিবার, প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সামনে বড় ধরনের দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতা কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পারিবারিক সচেতনতার ঘাটতি, সামাজিক নীরবতা, ক্ষমতার অপব্যবহার, অপরাধীর প্রতি প্রভাবশালীদের আশ্রয়, ভুক্তভোগীকে দোষারোপের প্রবণতা এবং অনেক ক্ষেত্রে বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা। ফলে শুধু অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর শাস্তির দাবি তুললেই সমস্যার সমাধান হবে না। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
আমরা জানি এ ভয়াবহ অপরাধের কোনো ভ্যাকসিন নেই, কিন্তু প্রতিরোধের উপায় অবশ্যই আছে। পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সম্মিলিতভাবে দায়িত্ব নিতে হবে। শিশুদের বয়সোপযোগী নিরাপত্তা শিক্ষা দিতে হবে। অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ, বিপদের পরিস্থিতি এবং সাহায্য চাওয়ার উপায় সম্পর্কে তাদের সচেতন করতে হবে। একই সঙ্গে অভিভাবকদেরও শিশুর আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।
শিশুদের নিরাপত্তার সঙ্গে আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগের বিষয়টিও সরাসরি জড়িত। অভিযুক্ত যে দলেরই হোক, যে প্রতিষ্ঠানেরই হোক কিংবা যত প্রভাবশালীই হোক, আইনের সামনে তার পরিচয় একটাই সে অভিযুক্ত। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হতে হবে এবং আদালতের মাধ্যমে অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয়, অর্থনৈতিক ক্ষমতা কিংবা সামাজিক প্রভাব যেন কোনোভাবেই বিচার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে না পারে।
ভুক্তভোগী শিশুর নিরাপত্তা ও মর্যাদার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ করার পর অনেক সময় ভুক্তভোগী ও তার পরিবারকেই সামাজিক অপমান, প্রশ্ন এবং দোষারোপের মুখোমুখি হতে হয়। এই সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। বিশেষ করে শিশুদের পরিচয় গোপন রাখা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা এবং আইনি সহযোগিতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব। একটি শিশু অপরাধের শিকার হওয়ার পর বিচার চাইতে গিয়ে যেন দ্বিতীয়বার সামাজিক নির্যাতনের শিকার না হয়।
এক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। যৌন সহিংসতা কোনো দলীয় বিষয় নয়। এটি মানুষের নিরাপত্তা, মানবিক মর্যাদা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রশ্ন। নিজেদের দলের কেউ এমন অপরাধে অভিযুক্ত হলে তাকে রক্ষার চেষ্টা না করে নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়াকে সহযোগিতা করাই রাজনৈতিক নৈতিকতার পরিচয়। অপরাধীর পরিচয়ের চেয়ে অপরাধের গুরুত্ব বড় হতে হবে।
শুধু কঠোর শাস্তির কথা বলে সাময়িকভাবে জনমত সন্তুষ্ট করার মধ্যেই দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। প্রয়োজন এমন একটি কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা, যেখানে অপরাধের ঝুঁকি কমবে, অভিযোগ দ্রুত গ্রহণ হবে, তদন্ত নিরপেক্ষ হবে, ভুক্তভোগী সুরক্ষা পাবে এবং আদালতের মাধ্যমে অপরাধ প্রমাণিত হলে যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত হবে। পাশাপাশি পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে নিয়মিত সচেতনতা কার্যক্রম চালাতে হবে।
একটি শিশুর নিরাপদ শৈশব কোনো অনুগ্রহ নয়, এটি তার অধিকার। সেই অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু পরিবারের নয়, রাষ্ট্র এবং সমাজেরও। পরিবারকে সচেতন হতে হবে, প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্বশীল হতে হবে, প্রশাসনকে সক্রিয় হতে হবে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিরপেক্ষ হতে হবে এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে শিশুদের নিরাপত্তার পক্ষে দাঁড়াতে হবে।
আমরা এমন একটি দেশ চাই, যেখানে কোনো শিশু ভয় নিয়ে বড় হবে না, কোনো পরিবার সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কে থাকবে না এবং কোনো অপরাধী তার পরিচয়, ক্ষমতা কিংবা প্রভাবের কারণে আইনের ঊর্ধ্বে থাকতে পারবে না। অপরাধ ঘটার পর প্রতিক্রিয়া দেখানোর পাশাপাশি অপরাধ ঘটার আগেই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। কারণ একটি শিশুকে নিরাপদ রাখার দায়িত্ব ভবিষ্যতের নয়, আজকের।
তবুও সেই প্রশ্নটাই রেখে গেলাম- শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কবে?