নরসিংদীর রায়পুরায় মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের বিরুদ্ধে ফসলি জমি ও সরকারি খাসজমি দখলের অভিযোগ ঘিরে ভূমি প্রশাসনের নিরবতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে মেঘনা নদী থেকে কাঁকন নদী বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষিকাজ, সংকুচিত হচ্ছে জেলেদের জীবিকার সুযোগ এবং বিঘ্ন ঘটছে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে। এসব বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের দৃশ্যমান কোন পদক্ষেপের তথ্য পাওয়া যায়নি।
গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর তরি-গরি করে সরকারি খাসজমির দীর্ঘমেয়াদি লিজের বিপরীতে নির্ধারিত ১ কোটি ১৫ লাখ ৮৭ হাজার ৫০০ টাকা রাজস্ব আদায়ের কথা শোনা গেলেও তা সত্যিই আদায় হয়েছে কি না, সেই বিষয়েও উপজেলা ভূমি অফিস থেকে স্পষ্ট কোন জবাব পাওয়া যায় নি।
জমি দখলের অভিযোগ, সরকারি রাজস্বের হিসাব এবং নদীটির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ সব মিলিয়ে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট একাধিক প্রশ্ন সামনে এসেছে জনমনে । তবে এসব অভিযোগ বা প্রশ্নের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ভূমি প্রশাসনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট তথ্য বা উত্তর পাওয়া যায়নি। রায়পুরা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মুনমুন পালও এ বিষয়ে বক্তব্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি বছরের ১৪ এপ্রিল জাতীয় ও স্থানীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে ‘রায়পুরায় মেঘনা গ্রুপের থাবায় ফসলি, অকৃষি, সরকারি খাস জমি ও কাঁকন নদী’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। পরে ২৪ মে কাঁকন নদী দখল ও তদন্ত নিয়ে স্থানীয়দের অসন্তোষের বিষয়টি সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে। ২১ জুন প্রতিবেদন প্রকাশের জেরে সাংবাদিক হয়রানির অভিযোগ নিয়েও সংবাদ প্রকাশিত হয়।
একাধিকবার বিষয়টি গণমাধ্যমে আসার পরও অভিযোগগুলোর তদন্ত, সরকারি জমির প্রকৃত অবস্থা যাচাই কিংবা রাজস্ব আদায়ের বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের অগ্রগতি, জমির রেকর্ড এবং রাজস্ব আদায়ের নথি গুরুত্বপূর্ণ হলেও এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
সরকারি খাসজমির দীর্ঘমেয়াদি লিজের বিপরীতে নির্ধারিত ১ কোটি ১৫ লাখ ৮৭ হাজার ৫০০ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। নির্ধারিত অর্থ আদায় হয়ে থাকলে তার নথিভিত্তিক হিসাব এবং আদায় না হয়ে থাকলে বকেয়া রাজস্বের পরিমাণ—কোনোটিই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যে পরিষ্কার হয়নি।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, লিজসংক্রান্ত শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না এবং সরকারি রাজস্ব আদায়ের বিষয়টি নিয়মিত তদারকি করা হয়েছে কি না। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব না হওয়ায় রাজস্ব অনাদায় বা লিজের শর্ত লঙ্ঘনের বিষয়টি নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
রাজস্ব আদায়ের হিসাব, লিজের শর্ত এবং জমির শ্রেণি ও মালিকানা যাচাই করে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের স্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া গেলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত চিত্র আরও পরিষ্কার হতে পারে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মেঘনা নদী থেকে কাঁকন নদী বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় নদীটির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে আশপাশের কৃষিকাজ ও মৎস্য আহরণে। নদীর ওপর নির্ভরশীল জেলেদের জীবিকার সুযোগ কমে আসার পাশাপাশি ফসলি জমিতে আগের মতো উৎপাদন হচ্ছে না বলেও জানিয়েছেন তাঁরা।
স্থানীয়দের দাবি, কাঁকন নদীর সঙ্গে মেঘনা নদীর পুনঃসংযোগ স্থাপনে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা, উদ্যোগ কিংবা বাস্তবায়নের অগ্রগতি সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার পেছনে কী কী কারণ রয়েছে, কোথায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে এবং এর সঙ্গে জমি ভরাট বা দখলের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না—এসব বিষয় সরেজমিন তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট নথি যাচাইয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
কাঁকন নদীর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী পাগলনাথ মন্দিরের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান। নদীটি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় পূর্ণিমা তিথিতে পুণ্যস্নানসহ বিভিন্ন ধর্মীয় আয়োজনে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ সমস্যায় পড়ছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মহাসচিব সজল পাল চৌধুরী বলেন, গত কয়েক বছর ধরে নদীসংক্রান্ত সমস্যার কারণে হিন্দু সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো বিঘ্নিত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করেন।
নদীটির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা শুধু কৃষি ও মৎস্যসম্পদের জন্যই নয়, স্থানীয় ঐতিহ্য ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারি খাসজমির লিজের বিপরীতে রাজস্ব আদায় এবং সংবাদ প্রকাশের পর ভূমি প্রশাসনের পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে রায়পুরা ইউনিয়ন ভূমি কার্যালয়ের উপসহকারী ভূমি কর্মকর্তা আবু জাফর মো. শরীফের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি বলেন, এ বিষয়ে তাঁর কিছু জানা নেই। তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিষয়টি জানেন উল্লেখ করে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।
ভূমি প্রশাসনের দায়িত্বশীল দুই পর্যায়ের কর্মকর্তার বক্তব্যে অভিযোগগুলোর নিষ্পত্তি, তদন্তের অগ্রগতি কিংবা রাজস্ব আদায়ের বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য না পাওয়ায় অভিযোগগুলোর বিষয়ে প্রশাসনিক তদারকি ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
অভিযোগের বিষয়ে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের রায়পুরা শাখার উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) মো. জালাল উদ্দিনের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, আগামীকাল সকালে আপনি ফোন দিয়েন। এখন আমি ব্যস্ত আছি।
ফসলি জমি ও সরকারি খাসজমি দখলের অভিযোগ, দীর্ঘমেয়াদি লিজের বিপরীতে নির্ধারিত রাজস্ব আদায় এবং কাঁকন নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়ার বিষয়গুলো জনস্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এসব অভিযোগের প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণে জম