ছড়িয়ে পড়ছে গরুর চর্মরোগ লাম্পি স্কিন, কুরবানির বাজারে ধসের শঙ্কা

Date: 2026-05-13
news-banner

চাঁদপুর প্রতিনিধি: 


কুরবানির ঈদকে সামনে রেখে চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলায় ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়েছে গরুর ভাইরাসজনিত চর্মরোগ ‘লাম্পি স্কিন ডিজিজ’ (এলএসডি)। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে শত শত গরু আক্রান্ত হওয়ায় আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন খামারি ও গরু ব্যবসায়ীরা। ইতোমধ্যে অনেক খামারি তাদের লালন-পালন করা গরু হারিয়ে চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন।


স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ইসলামাবাদ, সুলতানাবাদ, ফরাজিকান্দি, এখলাসপুর, জহিরাবাদ, ষাটনল, সাদুল্ল্যাপুর, বাগানবাড়ি, ফতেহপুর ইউনিয়ন এবং ছেংগারচর পৌর এলাকার প্রায় প্রতিটি গ্রামেই কমবেশি গরু আক্রান্ত হয়েছে। আক্রান্ত গরুর শরীরে গুটি, জ্বর, ক্ষত ও চামড়া পচে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিচ্ছে। এতে দুধ উৎপাদন কমে যাচ্ছে এবং বাজারমূল্যও হ্রাস পাচ্ছে।


খামারিদের অভিযোগ, সরকারি পর্যায়ে পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন না থাকায় রোগ প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে ব্যয়বহুল চিকিৎসা করিয়েও অনেক গরুকে বাঁচানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে ঈদকেন্দ্রিক পশু ব্যবসায় বড় ধরনের ধস নামার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।


সোমবার (১১ মে) গজরা ইউনিয়নের খাককান্দা গ্রামে হৃদয়বিদারক এক ঘটনা ঘটে। প্রান্তিক খামারি হোসনেয়ারা বেগমের প্রায় আড়াই লাখ টাকা মূল্যের একটি গরু লাম্পি স্কিন রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস হারিয়ে তিনি এখন দিশেহারা।


ছেংগারচর পৌরসভার ওটারচর গ্রামেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। কয়েকদিন আগে এক খামারি পরিবারের পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা গাভী এ রোগে মারা যায়। একই গ্রামের অটোচালক কাসেমের একটি বাছুরও ভাইরাসটির আক্রমণে মারা গেছে।


ইসলামাবাদ ইউনিয়নের বাসিন্দা শুভ জানান, প্রায় ২০ দিন আগে তাদের নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা গাভী মারা গেছে। গাভীটির ওপরই পরিবারের বড় ধরনের আশা নির্ভর করছিল। একই ধরনের ক্ষতির কথা জানান খামারি আলম নুরী। কয়েকদিন আগে তার শখের গরুটি মারা যাওয়ায় তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।


ওটারচর গ্রামের ক্ষুদ্র খামারি আতাউর রহমান বলেন, “চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অনেক টাকা খরচ করেও আমার গরুটিকে বাঁচাতে পারিনি। ডাক্তাররা বলেছেন, এই রোগের নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই।”


সুজাতপুর গ্রামের খামারি জসিম উদ্দিন বলেন, “চারদিকে যেভাবে রোগ ছড়াচ্ছে, তাতে প্রতিদিন আতঙ্কে থাকতে হচ্ছে। ঈদের আগে গরু আক্রান্ত হলে ব্যবসায় ভয়াবহ ক্ষতি হবে।”


মাঠ পর্যায়ে দেখা গেছে, মশা ও মাছির মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এ ভাইরাসে আক্রান্ত গরু প্রথমে তীব্র জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছে। পরে শরীরজুড়ে গুটি বসন্তের মতো ক্ষত তৈরি হয়ে চামড়া পচে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ক্ষতস্থান থেকে রক্ত ও পুঁজ বের হচ্ছে। আক্রান্ত গরু খাবার গ্রহণ বন্ধ করে দুর্বল হয়ে পড়ছে।


বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষাকাল ও আর্দ্র আবহাওয়ায় এ রোগের সংক্রমণ আরও দ্রুত বৃদ্ধি পায়। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পুরো উপজেলার ডেইরি শিল্প বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়তে পারে।


প্রাণিস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানান, গোট পক্সের ভ্যাকসিন কিছু ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে। তবে সেই ভ্যাকসিনেরও সংকট রয়েছে। সাধারণত ২১ দিনের মধ্যে রোগটি নিয়ন্ত্রণে আসে। তাই আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বা নিবন্ধিত প্রাণিচিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. শ্যামল চন্দ্র দাস বলেন, “লাম্পি স্কিন রোগের নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। এটি একটি ভাইরাসজনিত রোগ। সচেতনতা ও পরিচর্যার মাধ্যমেই রোগ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।”


তিনি জানান, সরকারিভাবে ভ্যাকসিন খুবই সীমিত। তবে বেসরকারিভাবে কিছু ভ্যাকসিন পাওয়া যাচ্ছে। বর্তমানে পুরো উপজেলায় পাঁচ শতাধিক গরু এ রোগে আক্রান্ত রয়েছে। চলতি বছরে সরকারিভাবে প্রায় ৮০০ গরুকে ভ্যাকসিন দেয়া হয়েছে।


তিনি আরও বলেন, আক্রান্ত গরুকে আলাদা রাখতে হবে, খামার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে এবং মশা-মাছির আক্রমণ থেকে সুরক্ষিত রাখতে হবে। আক্রান্ত গাভীর দুধ বাছুরকে না খাইয়ে মাটিতে পুঁতে ফেলারও পরামর্শ দেন তিনি।

Leave Your Comments