নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি :
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার আলোচিত উমায়ের হত্যা মামলার প্রধান আসামি ও একাধিক হত্যা, অস্ত্র, মাদক এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযুক্ত ফারুক হোসেনকে গ্রেপ্তার করেছে যৌথবাহিনী। শুক্রবার গভীর রাতে উপজেলার শম্ভুপুরা ইউনিয়নের চিরকিশোরগঞ্জ এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করা হয়। পরে শনিবার সকালে তাকে সোনারগাঁ থানায় হস্তান্তর করা হলে পুলিশ আদালতে প্রেরণ করে। আদালত তার জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
সোনারগাঁ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম সারোয়ার গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ফারুক হোসেন দীর্ঘদিন ধরে শম্ভুপুরা, হোসেন্দীসহ আশপাশের এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আতঙ্ক সৃষ্টি করে আসছিল। তার বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র, মাদক, চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও নদীপথে অবৈধ কারবার নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, তার নাম উচ্চারণ করতেও সাধারণ মানুষ ভয় পেত।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, গত বছরের ২৪ ডিসেম্বর ফারুক তার সহযোগী সোহাগ ও বায়েজিদকে সঙ্গে নিয়ে উমায়ের নামে এক যুবককে ফোন করে ডেকে নেয়। পরে পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করে মরদেহ মেঘনা নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। নিখোঁজের তিনদিন পর মুন্সীগঞ্জ নৌ-পুলিশ নদী থেকে উমায়েরের মরদেহ উদ্ধার করে।
এ ঘটনায় নিহতের মা আনার কলি প্রথমে সোনারগাঁ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরবর্তীতে তদন্তের ভিত্তিতে সেটি হত্যা মামলায় রূপ নেয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ফারুকের বিরুদ্ধে আলী মাতাব্বর হত্যা মামলাসহ অন্তত সাতটি মামলা রয়েছে। একটি অস্ত্র মামলায় তার ১৭ বছরের সাজা হয়েছিল। পরে তিনি উচ্চ আদালত থেকে জামিনে বের হয়ে এলাকায় পুনরায় প্রভাব বিস্তার শুরু করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ফারুক একটি সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের নেতৃত্ব দিত। নদীপথ ব্যবহার করে মাদক চোরাচালান, চাঁদাবাজি, জোরপূর্বক দখল ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে রাখাই ছিল তার প্রধান কর্মকাণ্ড।
এছাড়া তার ছোট ভাই মাসুদও মাদক মামলার আসামি এবং কারাভোগ করেছে বলে জানা গেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দুই ভাই মিলে দীর্ঘদিন ধরে নদীপথে মাদকের বড় বড় চালান নিয়ন্ত্রণ করত।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা জানান, ফারুক ছিল এলাকার মূর্তিমান আতঙ্ক। তার বিরুদ্ধে কথা বললেই হুমকি আসতো। অনেকেই ভয়ে মামলা পর্যন্ত করতে সাহস পেত না।
একজন প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, “দিন দিন সে এতটাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল যে সাধারণ মানুষ সন্ধ্যার পর ঘর থেকে বের হতেও ভয় পেত। তার গ্রেপ্তারে এখন মানুষ কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছে।”
স্থানীয় সূত্রে আরও জানা গেছে, হোসেন্দী ইউনিয়নের তৎকালীন আওয়ামী লীগ সমর্থিত চেয়ারম্যান আক্তার হাজীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও ‘শুটার ম্যান’ হিসেবেও এলাকায় পরিচিত ছিল ফারুক। রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় থেকেই সে দীর্ঘদিন ধরে অপরাধ সাম্রাজ্য গড়ে তোলে বলে অভিযোগ রয়েছে।
নিহত উমায়েরের মা আনার কলি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার ছেলেকে ফোন করে ডেকে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। আমি এই হত্যার বিচার চাই। যারা আমার বুক খালি করেছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক।”
উমায়েরের স্ত্রী বলেন, আমার স্বামী কোনো অপরাধ করেনি। তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। আমি আমার সন্তানের বাবার হত্যার বিচার চাই।
এদিকে এলাকাবাসীর দাবি, ফারুক গ্রেপ্তার হলেও তার সহযোগীরা এখনও এলাকায় সক্রিয় রয়েছে। তারা দ্রুত সকল সন্ত্রাসীকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, দীর্ঘদিন রাজনৈতিক প্রভাব ও ভয়ভীতির কারণে ফারুকের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে সাহস পেত না। তবে সাম্প্রতিক এ গ্রেপ্তারের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মাঝে স্বস্তি ফিরে এসেছে এবং তারা আশা করছেন, এবার হয়তো সন্ত্রাস ও মাদকের ভয়াল ছায়া থেকে মুক্তি পাবে পুরো এলাকা।