​নারায়ণগঞ্জে ভুয়া সাংবাদিকদের অপকর্মে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী

Date: 2026-06-18
news-banner

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি:

শিল্প ও ব্যবসাসমৃদ্ধ জেলা নারায়ণগঞ্জে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে নামসর্বস্ব ও অনিবন্ধিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল এবং ফেসবুক পেজ। আর এসব তথাকথিত সংবাদমাধ্যমের হাত ধরে জেলাজুড়ে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে ‘সহঘোষিত’ ও অপেশাদার সাংবাদিকদের দৌরাত্ম্য। মূলধারার সাংবাদিকতার ন্যূনতম যোগ্যতা কিংবা সংবাদ প্রকাশের সাধারণ নিয়মকানুন না জেনেই অনেকে গলায় ‘প্রেস’ কার্ড ঝুলিয়ে জড়িয়ে পড়ছেন নানা অপকর্মে। এতে যেমন পেশাদার সাংবাদিকদের ভাবমূর্তি সংকটে পড়ছে, তেমনি বিভ্রান্ত ও হেনস্তার শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।

​২০০-৩০০ টাকায় মিলছে ‘সাংবাদিক’ কার্ড:
​অনুসন্ধানে জানা গেছে, শহরের কালিবাজারসহ বিভিন্ন এলাকার কিছু কম্পিউটারের দোকান ও প্রেস থেকে মাত্র ২০০-৩০০ টাকার বিনিময়ে আকর্ষণীয় ডিজাইনের ভুয়া ‘প্রেস কার্ড’ বানিয়ে নিচ্ছেন অনেকে। শিক্ষাগত যোগ্যতা কিংবা গণমাধ্যমের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা ছাড়াই এই কার্ড গলায় ঝুলিয়ে নিজেদের ‘বড় মাপের সাংবাদিক’ হিসেবে দাবি করছেন তারা।

​ভিউ বাড়ানোর চক্করে নারী উদ্যোক্তাদের মানহানি:
​অভিযোগ উঠেছে, ‘আমার নারায়ণগঞ্জ’ নামের একটি অনিবন্ধিত ফেসবুক নিউজ পোর্টাল চালিয়ে আসছেন জান্নাত ও প্রশান্ত নামের দুই ব্যক্তি। গত মঙ্গলবার ওই পেজে ‘নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় আত্মীয় সাজিয়ে চলছে রমরমা দেহ ও মাদক ব্যবসা’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রচার করা হয়। সেই সংবাদের কমেন্ট বক্সে মূল ঘটনার সাথে কোনো সম্পৃক্ততা নেই—এমন কয়েকজন স্থানীয় নারী উদ্যোক্তাকে জড়িয়ে একটি ফেক আইডি থেকে অত্যন্ত আপত্তিকর ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা হয়। এতে তীব্র মানহানির শিকার হচ্ছেন ওই নারী উদ্যোক্তারা।

​এই বিষয়ে ক্ষোভ ও কান্নাজড়িত কণ্ঠে ভুক্তভোগী নারীরা বলেন:
​"একটা অনলাইন পোর্টাল এভাবে নারীদের সম্মান নিয়ে খেলবে, এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এই নোংরা মন্তব্যের কারণে আমাদের পরিবারের সম্মান নষ্ট হচ্ছে, পুরো পরিবার আজ চরম মানসিকভাবে চিন্তিত। সমাজের মানুষের চোখে আমরা অন্যরকম দৃষ্টিতে পড়ে যাচ্ছি। আমরা সততার সাথে ব্যবসা করে টিকে থাকার চেষ্টা করছি, আর কিছু ভিউয়ের জন্য আমাদের এভাবে সামাজিক হেনস্তা করা হচ্ছে।"


​নেপথ্যে অপরাধের রেকর্ড ও সাবেক পুলিশ কর্মকর্তার নাম:
​স্থানীয়দের তথ্যমতে, জান্নাত ও প্রশান্ত নামের এই দুই ‘সহঘোষিত’ সাংবাদিককে মূলত ‘হলুদ সাংবাদিক’ হিসেবেই চেনে নারায়ণগঞ্জের মানুষ। এর আগেও ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে স্থানীয় কয়েকটি মূলধারার পত্রিকায় এদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। এমনকি অপকর্ম করার সময় পুলিশ তাদের হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে পরে এমন অপরাধ কর্মকান্ড করবে না বলে মুচলেকা দিয়ে ছাড়া হয়। কিন্তু সাজা খাটার পর জামিনে বেরিয়ে এসে তারা আবারও একই অপকর্মে মেতে উঠেছে।

​অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, এই চক্রটি নিজেদের আড়াল করতে এবং পুলিশের ভয় দেখিয়ে পার পেতে ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছে। তাদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা দাবি করে, ‘আমার নারায়ণগঞ্জ’ পোর্টালটির সম্পাদক নাকি একজন সাবেক এসআই (সাব-ইন্সপেক্টর) জলিল। একজন সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা কীভাবে এই ধরণের একটি বিতর্কিত ও অনিবন্ধিত পোর্টালের সম্পাদক হতে পারেন—তা নিয়ে এখন স্থানীয় সচেতন মহলে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

​লক্ষ্য কেবল ব্ল্যাকমেইলিং ও ‘ধান্দাবাজি’:
​স্থানীয় সচেতন মহল ও পেশাদার সাংবাদিকদের অভিযোগ, এই সহঘোষিত সাংবাদিকদের বড় একটি অংশের মূল লক্ষ্যই থাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের পেজের ভিউ বাড়ানো এবং ব্ল্যাকমেইলিংয়ের মাধ্যমে নিজস্ব ‘ধান্দা’ হাসিল করা। কোনো একটি ঘটনা ঘটলে তথ্যের সত্যতা যাচাই না করে, নিজের মনগড়া ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গল্প সাজিয়ে তারা নিউজ হিসেবে প্রচার করছে। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার তোয়াক্কা না করে সমাজ ও ব্যক্তির সম্মানহানি করাই যেন এদের প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

​একটি সংবাদ তৈরিতে তথ্যের উৎস যাচাই, উভয় পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ এবং পেশাদারিত্বের যে মৌলিক দিকগুলো রয়েছে, সে সম্পর্কে এদের বিন্দুমাত্র ধারণা নেই। অথচ এই ভুয়া পরিচয় ও কার্ডের প্রভাব খাটিয়ে তারা বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি দপ্তর, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকে নানাবিধ ভয়ভীতি দেখিয়ে অনৈতিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা চালাচ্ছে।

​ক্ষুব্ধ মূলধারার সাংবাদিক ও প্রশাসন:
​এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জের প্রবীণ ও মূলধারার সাংবাদিকরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন:

​"সাংবাদিকতা একটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও দায়িত্বশীল পেশা। কিন্তু কতিপয় সুযোগসন্ধানী, দাগী অপরাধী ও অপেশাদার মানুষের কারণে আজ এই পবিত্র পেশার দিকে আঙুল উঠছে। প্রশাসনের উচিত অবিলম্বে এসব অনিবন্ধিত নিউজ পোর্টাল, ভুঁইফোড় ফেসবুক পেজ এবং কালিবাজারের কার্ড তৈরির উৎসগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া।"


​এদিকে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, ভুয়া সাংবাদিকতা ও সাংবাদিকতার নামে চাঁদাবাজি-ব্ল্যাকমেইলিংয়ের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলেই এই চক্রের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

​নারায়ণগঞ্জের সচেতন নাগরিক সমাজ মনে করে, সুস্থ ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে এবং সাধারণ মানুষকে এই ‘কার্ডধারী’ অপকর্মকারীদের হাত থেকে রক্ষা করতে জেলা প্রশাসন ও তথ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত এবং কঠোর তদারকি এখন সময়ের দাবি।

Leave Your Comments