১৩৭ বছরের গৌরবগাথা: দক্ষিণাঞ্চলের শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র বিএম কলেজ

Date: 2026-06-21
news-banner

আবু জাফর বিশ্বাস, বরিশালঃ 

দক্ষিণাঞ্চলের উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে এক অনন্য আলোকবর্তিকা বরিশাল সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ। ১৩৭ বছরের গৌরবময় পথচলা অতিক্রম করে আজও প্রতিষ্ঠানটি জ্ঞান, মানবিকতা, দেশপ্রেম ও প্রগতিশীল চেতনার এক উজ্জ্বল প্রতীক। সময়ের নানা পরিবর্তন ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেও শিক্ষা বিস্তারে এর অবদান আজও অনন্য। গত ১৪ জুন আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, স্মৃতিচারণ ও নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে উদ্‌যাপিত হয়েছে কলেজটির ১৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী।

১৮৮৯ সালের ১৪ জুন শিক্ষানুরাগী সমাজসংস্কারক মহাত্মা অশ্বিনীকুমার দত্ত তাঁর পিতা ব্রজমোহন দত্তের স্মৃতিকে অমর করে রাখতে প্রতিষ্ঠা করেন ব্রজমোহন কলেজ। শিক্ষিত, সচেতন, নৈতিক ও দেশপ্রেমিক নাগরিক গড়ে তোলার যে মহৎ স্বপ্ন নিয়ে এ বিদ্যাপীঠের যাত্রা শুরু হয়েছিল, দেড় শতাব্দীর দ্বারপ্রান্তে এসেও সেই আদর্শই প্রতিষ্ঠানটির মূল চালিকাশক্তি।

প্রায় ৬০ একরজুড়ে বিস্তৃত সবুজ-শ্যামল ক্যাম্পাস যেন প্রকৃতি ও শিক্ষার এক অপূর্ব মিলনস্থল। শতবর্ষ গেট, ঐতিহাসিক মূল ভবন, জীবনানন্দ চত্বর, মুক্তিযুদ্ধের শহীদ স্মৃতিফলক, নাগলিঙ্গম, কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া ও জারুলের রঙিন সমারোহ ক্যাম্পাসজুড়ে সৃষ্টি করেছে এক মনোমুগ্ধকর পরিবেশ। তাই বিএম কলেজ শুধু শিক্ষাঙ্গন নয়, বরিশালের অন্যতম নান্দনিক ও ঐতিহ্যবাহী দর্শনীয় স্থানও বটে।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২–৭৩ শিক্ষাবর্ষে অনার্স শিক্ষা চালুর মাধ্যমে কলেজটি উচ্চশিক্ষার নতুন দিগন্তে প্রবেশ করে। বর্তমানে ২২টি বিষয়ে অনার্স ও ২১টি বিষয়ে মাস্টার্স কোর্স চালু রয়েছে। ২০১৬–১৭ শিক্ষাবর্ষে পুনরায় চালু হয় উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা কার্যক্রম। বর্তমানে প্রায় ২৪ হাজার শিক্ষার্থী এ প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করছে। শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে রয়েছে ১১টি একাডেমিক ভবন, সাতটি আবাসিক হল, সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার, আধুনিক অডিটোরিয়াম, প্রশাসনিক ভবন ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য অবকাঠামো।

শুধু পাঠদানেই নয়, বিতর্ক, সাহিত্য, নাটক, সংগীত, বিজ্ঞানচর্চা, তথ্যপ্রযুক্তি, ক্রীড়া, রক্তদান ও স্বেচ্ছাসেবামূলক কর্মকাণ্ডেও বিএম কলেজের শিক্ষার্থীরা আঞ্চলিক ও জাতীয় পর্যায়ে ধারাবাহিক সাফল্যের স্বাক্ষর রেখে চলেছেন।

দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও স্বাধীনতার সংগ্রামে বিএম কলেজের ভূমিকা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা সাহসিকতার সঙ্গে অংশগ্রহণ করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে কলেজের ৪২ জন শিক্ষক ও শিক্ষার্থী শহীদ হন। এ বিদ্যাপীঠের শিক্ষার্থী ছিলেন বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর। এছাড়াও কবি জীবনানন্দ দাশ ও দার্শনিক আরজ আলী মাতুব্বরের মতো কৃতী ব্যক্তিত্বের স্মৃতিতে আজও গৌরবান্বিত বিএম কলেজ।

তবে শতবর্ষের ঐতিহ্যের পাশাপাশি কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জও রয়েছে। শ্রেণিকক্ষ ও কেন্দ্রীয় অডিটোরিয়ামের সংকট, কয়েকটি বিভাগে শিক্ষকস্বল্পতা, জলাবদ্ধতা এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এখনো উন্নয়নের পথে বাধা হয়ে রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, গবেষণাগার সম্প্রসারণ, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা এবং যুগোপযোগী অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে বিএম কলেজ দক্ষিণাঞ্চলের উচ্চশিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে আরও শক্তিশালী ভূমিকা পালন করবে।

সত্য, প্রেম ও পবিত্রতার আদর্শে প্রতিষ্ঠিত বিএম কলেজ কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি বরিশালের শিক্ষা, সংস্কৃতি, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও প্রগতিশীল সমাজ গঠনের অন্যতম ভিত্তি। ১৩৭ বছরের গৌরবময় অভিযাত্রা শেষে আজও এই বিদ্যাপীঠ নতুন প্রজন্মকে আলোকিত ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিয়ে চলেছে।

সমৃদ্ধ বিএম কলেজ মানেই সমৃদ্ধ বরিশাল—এই বিশ্বাস আজও অটুট, আগামীতেও থাকবে অমলিন।

Leave Your Comments