অনিজস্ব প্রতিবেদক:
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) তাদের ‘সেবা খাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালের এক বছরের দুর্নীতির
একটি আশঙ্কাজনক চিত্র প্রকাশ করেছে। ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সময়ের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত এই জরিপে দেখা
গেছে, দেশের বিভিন্ন সেবা খাতে মোট ১২ হাজার ৬৩৩
কোটি ২০ লাখ টাকার
ঘুষ লেনদেন হয়েছে। দেশের আটটি বিভাগের গ্রাম ও শহরের ১
হাজার ১৪৯টি এলাকায় বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পরিচালিত এই জরিপে সুনির্দিষ্ট
১৮টি সেবা খাতের সার্বিক চিত্র উঠে এসেছে।
জরিপের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ মানুষকে সেবা নিতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি ও ঘুষের মুখোমুখি
হতে হয়েছে পাসপোর্ট অফিস এবং বিআরটিএ-তে। এর পরেই শীর্ষ
দুর্নীতিগ্রস্ত খাতগুলোর তালিকায় রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, কৃষি, ভূমি ও বিচারসংশ্লিষ্ট সেবা।
তবে ২০২৩ সালের তুলনায় একটি ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে; সার্বিকভাবে পরিবারপ্রতি গড় ঘুষের পরিমাণ
প্রায় ১০ শতাংশ কমে
দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ১২৪
টাকায়।
সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে দেশের সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা মোটেও সন্তোষজনক নয়। জরিপে অংশ নেওয়া সিংহভাগ পরিবারই স্পষ্ট জানিয়েছে যে ঘুষ ছাড়া
কোনো সরকারি সেবা পাওয়া এখন প্রায় অসম্ভব। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা ও বিচারিক সেবার
মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে দুর্নীতির এই উচ্চহার সাধারণ
মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। পাশাপাশি কৃষি, স্থানীয় সরকার, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো
জনগুরুত্বপূর্ণ মৌলিক খাতগুলোতেও দুর্নীতির এই প্রবণতা হয়
বেড়েছে, না হয় আগের
মতোই বহাল রয়েছে।
দুর্নীতির শিকার হওয়ার পরও দেশের বেশিরভাগ পরিবার কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক অভিযোগ করে না। এর পেছনে প্রধান
কারণ হিসেবে পুরো ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থাহীনতা এবং অভিযোগ করার সঠিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে অজ্ঞতাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। দুদক কিংবা সরকারি অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা (জিআরএস) সম্পর্কে খুব কম মানুষ জানলেও
সেখানে অভিযোগ জানানোর হার অত্যন্ত নগণ্য। তাছাড়া সাধারণ মানুষের মতে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, সচেতনতার অভাব এবং অপরাধীদের শাস্তির বদলে নানা সুবিধা পাওয়ার কারণেই দুর্নীতি দিন দিন আরও জাঁকিয়ে বসছে।
এই দুর্নীতির সামাজিক
ও অর্থনৈতিক প্রভাব সমাজের সব স্তরে সমান
নয়। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলের পরিবারগুলো বেশি ঘুষের শিকার হলেও মোট টাকার অঙ্কে শহরের মানুষকে বেশি অর্থ গুনতে হয়েছে। জরিপে আরও উঠে এসেছে যে, নিম্ন আয়ের মানুষ তাদের আয়ের তুলনায় অনেক বেশি হারে ঘুষ দিতে বাধ্য হচ্ছে, যা তাদের ওপর
বড় ধরনের আর্থিক বোঝা তৈরি করছে। পাশাপাশি নারী, আদিবাসী এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য এই পরিস্থিতি আরও
বেশি জটিল ও কষ্টকর হয়ে
উঠেছে। প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়, বিভিন্ন সেবা খাতে ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করার পরও দালালের ওপর মানুষের নির্ভরতা কমেনি, যার ফলে ঘুষ ও দুর্নীতির সুযোগগুলো
এখনো আগের মতোই রয়ে গেছে।