শামীমকে ঘিরে র‍্যাবের গ্রেপ্তার ও প্রেস ব্রিফিং নিয়ে প্রশ্ন: নিরপেক্ষ তদন্ত ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের দাবি পরিবারের

Date: 2026-07-05
news-banner

নিজস্ব প্রতিবেদক,

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের আলোচিত মো. শামীম পাটালীকে অস্ত্র মামলায় গ্রেপ্তারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে তার পরিবার। র‍্যাব-২-এর প্রেস ব্রিফিংয়ে উপস্থাপিত তথ্যের সঙ্গে বাস্তবতা ও আদালতের নথিতে থাকা বিভিন্ন তথ্যের অসঙ্গতি রয়েছে বলে দাবি করে তারা নিরপেক্ষ তদন্তের পাশাপাশি দেশের গণমাধ্যমের কাছে তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছে।

সম্প্রতি শামীমের মা কোহিনূর দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমের সম্পাদক ও বার্তা সম্পাদকের কাছে পাঠানো এক লিখিত আবেদনে অভিযোগ করেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রেস ব্রিফিংয়ের ভিত্তিতে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদে তাদের পরিবারের বক্তব্য, ঘটনার প্রেক্ষাপট এবং গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য স্থান পায়নি।

পরিবারের দাবি, শামীম কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না; বরং এলাকায় সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধ সম্পর্কে তথ্য দিয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহযোগিতা করতেন। সেই সূত্রেই র‍্যাব-২-এর সার্জেন্ট জুবায়েরের সঙ্গে তার পরিচয় হয় বলে পরিবারের ভাষ্য।

পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, গত ২৭ জুন সার্জেন্ট জুবায়ের ফোন করে শামীমকে গ্রীনসিটি এলাকার একটি রেস্টুরেন্টে ডেকে নেন। সেখানে নাস্তা করার পর তাকে আটকে রাখা হয় এবং পরে পরিবারের কাছে পাঁচ লাখ টাকা দাবি করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

পরিবারের দাবি, ওই অর্থ দিতে ব্যর্থ হওয়ার পর গভীর রাতে বিদেশি পিস্তল উদ্ধারের নাটক সাজিয়ে শামীমকে অস্ত্র মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। একই সঙ্গে তারা অভিযোগ করেন, ঘটনাটি আড়াল করতে সংশ্লিষ্ট রেস্টুরেন্টের সিসিটিভি ফুটেজ সরিয়ে ফেলা হয়েছে এবং জব্দ করা মোবাইল ফোনের কল রেকর্ডসহ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মুছে ফেলা হয়েছে।

এছাড়া পরিবারের অভিযোগ, বোটঘাট এলাকার র‍্যাবের কথিত সোর্স হিসেবে পরিচিত কিছু কিশোর গ্যাং সদস্য সার্জেন্ট জুবায়ের ও সার্জেন্ট জাকিরের সঙ্গে যোগসাজশ করে পূর্বপরিকল্পিতভাবে শামীমকে মিথ্যা অস্ত্র মামলায় ফাঁসিয়েছে।

পরিবারের দাবি, র‍্যাবের প্রেস ব্রিফিংয়ে শামীমকে 'পাটালী গ্রুপের' গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও অতীতে একই পরিবারের সদস্যরা ওই গ্রুপের হামলার শিকার হয়েছেন। ফলে একজন হামলার শিকার পরিবারের সদস্য কীভাবে একই গ্রুপের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হতে পারেন—এ প্রশ্নের সন্তোষজনক ব্যাখ্যা তারা পাননি বলে দাবি করেন।

তাদের মতে, প্রেস ব্রিফিংয়ে শামীমের বিরুদ্ধে আটটি মামলা থাকার যে তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে, সেটিও বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আদালতের নথি যাচাই করলে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে তাদের দাবি।

পরিবারের এক সদস্য বলেন, "আমাদের ছেলেকে পরিকল্পিতভাবে ফাঁসানো হয়েছে। ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকেই তাকে টার্গেট করা হয়েছে। আমরা চাই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হোক।"

শামীমের মা কোহিনূর তার আবেদনে উল্লেখ করেন, একটি দায়িত্বশীল গণমাধ্যমের কাজ হলো সরকারি বক্তব্যের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য, আদালতের নথি ও প্রমাণ যাচাই করে প্রকৃত তথ্য জনগণের সামনে তুলে ধরা।

তিনি দেশের গণমাধ্যমের কাছে তথ্য-উপাত্ত, আদালতের নথি, ডিজিটাল ফরেনসিক তথ্য এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক প্রমাণ যাচাই করে একটি নিরপেক্ষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের আহ্বান জানান।

পরিবার ও তাদের আইনজীবীর দাবি, প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের জন্য নিম্নোক্ত বিষয়গুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি—
- ২৭ জুন শামীম ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মোবাইল ফোনের কল ডিটেইল রেকর্ড (CDR) এবং টাওয়ার লোকেশন বিশ্লেষণ।
- গ্রীনসিটি এলাকার রেস্টুরেন্ট ও আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ ও পরীক্ষা।
- জব্দ করা মোবাইল ফোনের পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণ।
- জব্দ তালিকা ও আলামতের ফরেনসিক পরীক্ষা।
- শামীমের বিরুদ্ধে উল্লেখিত আটটি মামলার বর্তমান আইনি অবস্থা আদালতের নথির মাধ্যমে যাচাই।
পরিবারের দাবি, এসব বিষয় নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হলে প্রকৃত ঘটনা স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

পরিবার জানায়, যদি অবিলম্বে বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত না করা হয়, তাহলে তাদের কাছে থাকা নথিপত্র, তথ্য-উপাত্ত ও অন্যান্য প্রমাণসহ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি), র‍্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি), র‍্যাব-২-এর অধিনায়কসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দাখিল করা হবে।

তাদের ভাষ্য, তদন্তে যদি তাদের অভিযোগ অসত্য প্রমাণিত হয়, তবে তারা তা মেনে নেবেন। তবে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা।

পরিবারের উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।

Leave Your Comments