প্রকাশ : ০৯ আগস্ট ২০২৬
সময়: ১১:০৮ এএম
কুলিয়ারচরের দড়িগাঁও গ্রামে ১৬ মৌজার জমিদার: ব্রহ্মপুত্রের তীরে বসে হারিয়ে যাওয়া আলী গৌহর খানের গল্প
মোঃ মাইন উদ্দিন :
জমিদার- শব্দটির মধ্যেই যেন একসময়কার ক্ষমতা, প্রতিপত্তি, ঐশ্বর্য আর এক ভিন্ন সময়ের গন্ধ মিশে আছে। উপমহাদেশের ইতিহাসে জমিদাররা ছিলেন এমন এক শ্রেণির ভূস্বামী, যাঁদের হাতে ছিল বিস্তীর্ণ জমি, প্রভাব-প্রতিপত্তি এবং রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা। মুঘল আমল থেকে শুরু করে ব্রিটিশ শাসনামলে জমিদারি প্রথা নানা রূপে বিস্তৃত হয়েছে। তাঁদের কেউ ছিলেন রাজা, কেউ রায়, কেউ চৌধুরী, কেউ নবাব, আবার কেউ স্থানীয়ভাবে পরিচিত ছিলেন প্রভাবশালী ভূস্বামী হিসেবে।
কালের স্রোতে সেই জমিদারি প্রথা আজ বিলীন হয়েছে। বদলে গেছে রাষ্ট্রব্যবস্থা, বদলে গেছে সমাজের কাঠামো, বদলে গেছে ক্ষমতার কেন্দ্রও। কিন্তু কিছু পরিবারের বাড়িতে, কিছু পুরোনো দলিলে, কিছু ভগ্ন স্থাপনায় এবং সবচেয়ে বেশি- বৃদ্ধ মানুষের স্মৃতিতে আজও বেঁচে আছে সেই সময়ের জমিদারদের গল্প। আর তেমনই এক গল্প শুনলাম শুক্রবার (৭ আগস্ট) দুপুরে।
অতিথি হয়ে গিয়েছিলাম কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার সালুয়া ইউনিয়নের দড়িগাঁও গ্রামের মিয়া বাড়িতে। পুরনো ব্রহ্মপুত্র নদের তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা দড়িগাঁও গ্রামের এই বাড়িটি একসময়কার জমিদার আলী গৌহর খানের বংশধরদের বাড়ি হিসেবে পরিচিত। আমন্ত্রণে ছিল আন্তরিকতা, আয়োজনের মধ্যে ছিল পারিবারিক আবেগ, আর নদীর পাড়ের নীরবতায় যেন মিশে ছিল বহু বছরের পুরোনো ইতিহাস।
শুক্রবার দুপুর। আকাশে মেঘ-রোদের লুকোচুরি খেলা। গ্রামের পথ পেরিয়ে যখন দড়িগাঁও গ্রামে মিয়া বাড়িতে পৌঁছালাম, তখন বাড়ির দক্ষিণ পাশে পুরনো ব্রহ্মপুত্রের তীরে ঈদগাহ মাঠে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন প্রায় শেষ পর্যায়ে। তখন এখানে নদী পেরিয়ে আসা দক্ষিণা বাতাসে ছিল এক ধরনের প্রশান্তি। শহুরে কোলাহল থেকে বহু দূরে, চারদিকে সবুজ আর নীরবতা। অথচ এই নীরবতার ভেতরেই লুকিয়েছিল কয়েক প্রজন্মের ইতিহাস।
খাবারের আয়োজন শেষ হলো। এরপর শুরু হলো গল্পের আসর। কেউ বলছেন পুরোনো দিনের কথা, কেউ স্মরণ করছেন বংশের প্রয়াত মানুষদের, কেউবা বলছেন জমিদারি আমলের শোনা গল্প। গল্পের এক পর্যায়ে কথার স্রোত গিয়ে ঠেকল প্রায় দুই শতাধিক বছর আগের এক সময়ের জমিদার আলী গৌহর খানের সময়ে।
আর এই আয়োজনে যাঁর আমন্ত্রণে আমার সেখানে যাওয়া, তিনি হলেন সালুয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক ইউপি সদস্য মোঃ রোমান খান। আয়োজনের মূল উদ্যোক্তা হলেন মোঃ সোলাইমান খান। দুজনই আলী গৌহর খানের পঞ্চম বংশধর বলে জানান তাঁরা। তবে এটি নিছক কোনো পারিবারিক ভোজের আয়োজন ছিল না। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, বংশের প্রয়াত সদস্যদের রুহের মাগফেরাত কামনা করে দোয়া ও বিশেষ মোনাজাতের উদ্দেশ্যেই ছিল এই আয়োজন।
জমিদার আলী গৌহর খানের বিষয়ে জানতে চাইলাম প্রায় নব্বই বছর বয়সী মোঃ বুলবুল খানের কাছে। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়েছে, কিন্তু স্মৃতির ভাণ্ডারে এখনো জমে আছে বংশের বহু পুরোনো কথা। তিনি নিজেকে আলী গৌহর খানের চতুর্থ বংশধর হিসেবে পরিচয় দিলেন। জানতে চাইলাম জমিদার আলী গৌহর খানের জমির পরিমাণ কত ছিল? কিছুক্ষণ ভেবে তিনি জানালেন, আলী গৌহর খান ছিলেন ১৬ মৌজা জমির মালিক।
সংখ্যাটি শুনে বর্তমান সময়ের মানুষ হয়তো সহজেই তার ব্যাপ্তি উপলব্ধি করতে পারবেন না। কারণ মৌজা শুধু জমির পরিমাণ বোঝানোর একটি শব্দ নয়, গ্রামীণ ভূমি ব্যবস্থার ইতিহাসে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও ভূমি-একক। একসময় একটি জমিদারের অধীনে বহু মৌজা থাকা মানেই ছিল বিস্তীর্ণ ভূসম্পত্তির ওপর তাঁর কর্তৃত্ব।
বুলবুল খানের বর্ণনায় আলী গৌহর খানের দুই পুত্র ছিলেন। বড় ছেলের নাম ইউসুফ আলী খান এবং ছোট ছেলের নাম নূর চাঁন খান। নব্বই বছরের এই মানুষটির যতটুকু জানা, তিনি ততটুকুই বললেন। ইতিহাসের বড় বড় বইয়ে হয়তো এই পরিবারের নাম পাওয়া যাবে না। সরকারি কোনো নথিতে হয়তো তাদের বিস্তৃত বিবরণও নেই। কিন্তু একটি পরিবারের ভেতর প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা স্মৃতিও তো ইতিহাসেরই এক ধরনের দলিল।
জমিদারি প্রথা ছিল একটি নির্দিষ্ট সময়ের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা। জমিদাররা ভূমির ওপর কর্তৃত্ব রাখতেন এবং বিভিন্ন সময়ে রাজস্ব আদায় করতেন। ব্রিটিশ শাসনামলে জমিদারি ব্যবস্থা আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। তবে সেই ব্যবস্থার সঙ্গে কৃষক ও প্রজাদের জীবনও জড়িয়ে ছিল নানা বৈপরীত্যে। একদিকে ছিল জমিদারদের ঐশ্বর্য, সামাজিক প্রতিপত্তি ও প্রভাব, অন্যদিকে ছিল সাধারণ মানুষের খাজনা, ভূমি ও জীবিকার নানা সংকট। তাই জমিদারি ইতিহাস শুধু রাজকীয় জীবনযাপনের গল্প নয়- এটি একই সঙ্গে শ্রেণি, ভূমি, ক্ষমতা ও সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামের ইতিহাস।
কালের বিবর্তনে সেই ব্যবস্থা বিলীন হয়েছে। জমিদারদের প্রভাবও হারিয়েছে। বিশাল ভূসম্পত্তি টুকরো টুকরো হয়েছে উত্তরাধিকার সূত্রে। কেউ শহরে গেছেন, কেউ বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন, কেউবা পেশা বদলে সাধারণ মানুষের জীবনে মিশে গেছেন। কিন্তু নামটি রয়ে গেছে জমিদার বাড়ি। কোথাও হয়তো পুরোনো দালান নেই, নেই জমিদারি আমলের সেই চাকচিক্য। তবুও বাড়ির প্রবীণ মানুষের মুখে যখন পূর্বপুরুষের নাম উচ্চারিত হয়, তখন মনে হয় ইতিহাস আসলে পুরোপুরি হারিয়ে যায় না, এর কিছু অংশ মানুষের স্মৃতিতে আশ্রয় নেয়।
পুরনো ব্রহ্মপুত্রের তীরে বসে এসব গল্প শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল- নদীও বুঝি এই পরিবারের ইতিহাসের নীরব সাক্ষী। এই নদী কত মানুষকে দেখেছে। কত নৌকা চলেছে তার বুকের ওপর দিয়ে। কত জমিদার এসেছে, কত কৃষক খাজনা দিয়েছে, কত উৎসব হয়েছে, কত কান্না নদীর বাতাসে মিশে গেছে- তার কোনো হিসাব নেই।
একসময় যেসব জমি নিয়ে মানুষের গর্ব ছিল, আজ সেসব জমির সীমানাও হয়তো বদলে গেছে। যে পরিবারকে কেন্দ্র করে কোনো এলাকায় প্রভাব ও প্রতিপত্তির গল্প তৈরি হয়েছিল, আজ সেই পরিবারের উত্তরসূরিরাই বসে পূর্বপুরুষদের স্মৃতি খুঁজছেন। আসলে সময়ের এটাই নিয়ম, নদী যেমন তার গতিপথ বদলায়, তেমনি বদলায় মানুষের জীবনও।
গল্প আর আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম খান, মোঃ দুলাল মিয়া, মোঃ রেয়াজউল করিম, মোঃ রোমান খান, মোঃ মিজানুল ইসলাম খান বাবু, মোঃ রানা খান, অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী মোঃ ফয়জুল সরকার ও বজলুল করিম শামিমসহ আরও অনেকে।
তাঁদের কথার ফাঁকে ফাঁকে উঠে আসছিল বংশের নানা স্মৃতি। কেউ জানেন একটি ঘটনা, কেউ জানেন আরেকটি। কারও কাছে আছে কোনো পূর্বপুরুষের নাম, কারও কাছে আছে বাড়ির পুরোনো কোনো কাহিনি। এভাবেই মৌখিক ইতিহাস বেঁচে থাকে। এক প্রজন্ম অন্য প্রজন্মকে বলে যায়- আমাদের পূর্বপুরুষ এমন ছিলেন, এই জমি একসময় আমাদের ছিল, এই বাড়িতে এমন মানুষ থাকতেন।
কিন্তু বিপদও আছে। যাঁরা এসব জানেন, তাঁদের বয়স এখন অনেক। তাঁদের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে বহু অমূল্য তথ্য। ফলে পারিবারিক ইতিহাস সংরক্ষণের উদ্যোগ না থাকলে একদিন হয়তো এসব গল্পের কোনো শ্রোতাই থাকবে না।
দড়িগাঁও গ্রামের জমিদার বাড়িটি এখন মিয়া বাড়ি নামেই দেশ-বিদেশে পরিচিত। মিয়া বাড়িতে বসে মনে হলো, আমরা ইতিহাস বলতে অনেক সময় শুধু রাজা-বাদশাহ, যুদ্ধ, রাজনৈতিক আন্দোলন কিংবা ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের ইতিহাসকেই বুঝি। অথচ একটি গ্রামের একটি পরিবারের ইতিহাসও তো বৃহত্তর ইতিহাসের অংশ। একজন জমিদারের ১৬ মৌজা জমি ছিল- এ তথ্য হয়তো একটি ছোট তথ্য। কিন্তু এর পেছনে আছে ভূমি ব্যবস্থার ইতিহাস, গ্রামীণ সমাজের কাঠামো, কৃষকের জীবন, উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পত্তির বিভাজন এবং সময় পরিবর্তনের দীর্ঘ গল্প। কিন্তু একটি পরিবার কীভাবে কয়েক প্রজন্মে বদলে গেল- সেটিও ইতিহাস। একটি বাড়ির উঠানে যে মানুষগুলো একসময় কর্তৃত্বের প্রতীক ছিলেন, তাঁদের উত্তরসূরিরা আজ সেখানে বসে তাঁদের জন্য দোয়া করেন- এটিও ইতিহাসের এক গভীর মানবিক অধ্যায়।
সময় তার নিজস্ব নিয়মে সবকিছু বদলে দেয়। একসময় জমিদার ছিলেন সমাজের ক্ষমতাবান ব্যক্তি। আজ সেই জমিদারি নেই। জমিদারও নেই। তাঁদের জায়গায় এসেছে নতুন ক্ষমতার কাঠামো। রাজনীতি, প্রশাসন, নির্বাচন, জনপ্রতিনিধিত্ব- সবকিছু মিলিয়ে সমাজের নেতৃত্বের ধরন বদলে গেছে। আজ ইতিহাসের পাতায় নতুন করে জায়গা করে নিচ্ছেন নেতা, সংসদ সদস্য, মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী ও মহামান্য রাষ্ট্রপতিগন। তাঁদের ছবি, বক্তব্য, কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রতিদিন সংবাদ তৈরি হচ্ছে। তাঁদের ঘিরে তৈরি হচ্ছে নতুন সময়ের দলিল। কিন্তু দুই শতাধিক বছর পর হয়তো আজকের এই ক্ষমতাবান মানুষদের অনেক কিছুই একইভাবে স্মৃতির গল্প হয়ে যাবে। কারণ ক্ষমতা স্থায়ী নয়। পদ স্থায়ী নয়। প্রভাবও স্থায়ী নয়। স্থায়ী হয়ে থাকে মানুষের কাজ, মানুষের স্মৃতি এবং সময়ের রেখে যাওয়া কিছু চিহ্ন।
দড়িগাঁও মিয়া বাড়ি থেকে ফেরার সময় পুরনো ব্রহ্মপুত্রের দিকে আরেকবার তাকিয়েছিলাম। নদী তখন শান্ত। অথচ তার বুকের ভেতর যেন বয়ে চলেছে শত বছরের কত গল্প। একসময় এই নদীর তীরে হয়তো জমিদারবাড়ির মানুষের আনাগোনা ছিল। হয়তো নৌকায় করে আসত মানুষ, জমিদারবাড়ির উঠানে বসত বৈঠক। কোথাও বাজত কলেরগান, কোথাও চলত হিসাব-নিকাশ। হয়তো কোনো কৃষক খাজনা দেওয়ার চিন্তায় ঘুমাতে পারতেন না। আবার কোনো উৎসবের দিনে সেই বাড়িতেই আনন্দের আয়োজন হতো। সেই সবই এখন অতীত। শুধু নদী আছে। নদীও তার মতো বয়ে যাচ্ছে। আর মানুষ তার তীরে দাঁড়িয়ে অতীতকে মনে করছে। দড়িগাঁও গ্রামে সেই দুপুরে শুধু একটি জমিদার পরিবারের গল্প শুনিনি, শুনেছি সময়ের গল্প। শুনেছি উত্থান-পতনের গল্প। শুনেছি ক্ষমতার ক্ষণস্থায়িত্বের গল্প।
বুঝলাম- ইতিহাস কখনো পুরোপুরি মরে না। কখনো তা পুরোনো কোনো বাড়ির দেয়ালে, কখনো নদীর বাতাসে, কখনো কোনো পুরোনো নামের সঙ্গে, আবার কখনো নব্বই বছরের এক বৃদ্ধের স্মৃতিতে বেঁচে থাকে। আর সেই স্মৃতিকে ধরে রাখার মানুষগুলো যতদিন আছেন, ততদিন কালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়া গল্পগুলোও পুরোপুরি হারিয়ে যাবে না।
বিকেলের শেষভাগে ব্রহ্মপুত্রের তীরে বসে মনে হলো- জমিদার নেই, জমিদারিও নেই, কিন্তু তাঁদের গল্প এখনো আছে। হয়তো এটাই ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর দিক- মানুষ চলে যায়, সময় বদলে যায়, কিন্তু গল্পগুলো থেকে যায় মানুষের হৃদয় জুড়ে।