আসিফ মাহমুদের পাচারকৃত ১১ হাজার কোটি টাকার খোজে দুদক
এস আই খান:
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে প্রায় ১৬ মাস দায়িত্ব পালনের পর রাজনীতিতে নামেন আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। দায়িত্বের শুরুতে তিনি সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির কথা বলেছিলেন। কিন্তু দায়িত্ব শেষ হওয়ার পর তাঁর বিরুদ্ধে একের পর এক অনিয়ম, দুর্নীতি, নিয়োগ-বদলি, টেন্ডার ও অর্থ পাচারের অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব অভিযোগ এখন আর শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; দুর্নীতি দমন কমিশন—দুদক এসব অভিযোগ অনুসন্ধানের আওতায় এনেছে। তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা এখনো আদালত বা চূড়ান্ত তদন্তে প্রমাণিত হয়নি—এ বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
দুদকের সর্বশেষ বক্তব্য অনুযায়ী, সাবেক এই উপদেষ্টার বিরুদ্ধে নিয়োগ, বদলি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে বিপুল অর্থ লেনদেন এবং বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগের নতুন তথ্য পাওয়া গেছে। এসব অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে চলমান অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুদক।
দুদকের কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগকে কেন্দ্র করে প্রায় ৬০ কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ অনুসন্ধানে এসেছে। একইভাবে দেশের ৩৬ জেলায় জেলা প্রশাসক নিয়োগে ২ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা করে লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে। এগুলো বর্তমানে অভিযোগের পর্যায়ে রয়েছে; তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার আগে এগুলোকে নিশ্চিত দুর্নীতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
প্রশ্ন উঠেছে, প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ ও পদায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাব কতটা কাজ করেছে এবং কোনো আর্থিক লেনদেন হয়ে থাকলে তার উৎস ও সুবিধাভোগী কারা। দুদকের অনুসন্ধান শেষ হলে এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার কথা।
আসিফ মাহমুদ স্থানীয় সরকার বিভাগের দায়িত্বে থাকাকালে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডারকে ঘিরে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। দুদকের বক্তব্য অনুযায়ী, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের টেন্ডার বাণিজ্য এবং উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডারে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ কমিশন নেওয়ার অভিযোগ অনুসন্ধানে এসেছে। নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের টেন্ডার নিয়েও অভিযোগ রয়েছে।
এ ধরনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা শুধু একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ হবে না; বরং স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রকল্প বাস্তবায়ন ও সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার ওপরও বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি করবে। বিশেষ করে উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডারে কমিশন নেওয়া হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে প্রকল্পের ব্যয়, কাজের মান এবং জনগণের অর্থের ওপর।
দুদকের অনুসন্ধানে আরও অভিযোগ এসেছে, স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীন গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও সেতু নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে বিপুল অর্থ আত্মসাতের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।
তবে এই অভিযোগের ক্ষেত্রে কোন প্রকল্পে কত টাকা বাড়ানো হয়েছে, সংশোধিত ডিপিপিতে কত টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সেই অতিরিক্ত অর্থের সঙ্গে কারা যুক্ত—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে নথিপত্র যাচাই করা প্রয়োজন। কারণ প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি নিজেই দুর্নীতির প্রমাণ নয়; ব্যয় বৃদ্ধির যৌক্তিকতা ও অর্থের ব্যবহারই এখানে মূল প্রশ্ন।
দুদকের বক্তব্যে ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় পর্যায়ে অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পের ব্যয় ১২০০ কোটি টাকা বাড়িয়ে অর্থ সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগের কথাও এসেছে।
এখানে তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে—ব্যয় বৃদ্ধির সরকারি অনুমোদন কীভাবে হয়েছে, সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের নথিতে কী কারণ দেখানো হয়েছে, কাজের বাস্তব অগ্রগতি কতটুকু এবং অতিরিক্ত বরাদ্দের অর্থ কোথায় ব্যয় হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ এসেছে বিদেশে বিপুল অর্থ পাচার নিয়ে। দুদকের বক্তব্য অনুযায়ী, অভিযোগ রয়েছে প্রায় ৪৫০০ কোটি টাকা দুবাই, ৩০০০ কোটি টাকা সিঙ্গাপুর, ২০০০ কোটি টাকা অস্ট্রেলিয়া এবং ১৫০০ কোটি টাকা সুইজারল্যান্ডে পাঠানোর। অর্থ দিয়ে বিদেশে বিলাসবহুল ভিলা কেনা এবং বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগের অভিযোগও অনুসন্ধানে এসেছে।
এছাড়া পর্তুগালে জমি কেনা, দুবাইভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ এবং সুইস ব্যাংকে অর্থ রাখার অভিযোগের কথাও দুদক জানিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তাঁর দুই শ্যালক ও এক ভাগ্নের মাধ্যমে বিপুল অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বিদেশি ব্যাংক হিসাব, সম্পত্তির দলিল, কোম্পানির মালিকানা, অর্থ স্থানান্তরের নথি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আর্থিক লেনদেন যাচাই করা। তদন্তে এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তা হবে অত্যন্ত গুরুতর আর্থিক অপরাধের বিষয়।
আসিফ মাহমুদের সাবেক সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) মোয়াজ্জেম হোসেনকে ঘিরে ২০২৫ সালে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, তদবির, চাঁদাবাজি, টেন্ডার কারসাজি এবং বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ তদন্ত করে দুদক। পরে আদালত তাঁর বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা এবং জাতীয় পরিচয়পত্র ব্লকের নির্দেশ দেন।
মোয়াজ্জেমকে আসিফ মাহমুদ নিজেই এপিএস হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর তাঁকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। আসিফ মাহমুদ সে সময় প্রকাশ্যে জানান, তিনি নিজেই তাঁর সাবেক এপিএসের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্ত করতে দুদককে অনুরোধ করেছিলেন।
এই ঘটনা অবশ্যই আসিফ মাহমুদের ব্যক্তিগত দুর্নীতির প্রমাণ নয়। কিন্তু একজন উপদেষ্টার ঘনিষ্ঠ সহযোগীর বিরুদ্ধে এত গুরুতর অভিযোগ ওঠায় তাঁর প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা ও নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
আসিফ মাহমুদকে ঘিরে আরেকটি বিতর্ক তৈরি হয়েছিল তাঁর বাবার ঠিকাদারি লাইসেন্স নিয়ে। বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা ও প্রশ্ন ওঠার পর লাইসেন্সটি বাতিল করা হয়। এই ঘটনাও রাজনৈতিকভাবে আলোচিত হয়।
তবে এখানেও সরাসরি আসিফ মাহমুদের ব্যক্তিগত দুর্নীতি প্রমাণিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। বরং প্রশ্নটি ছিল, ক্ষমতাসীন সরকারের একজন উপদেষ্টার পরিবারের সদস্য সরকারি ঠিকাদারি ব্যবস্থায় যুক্ত হলে সেখানে স্বার্থের সংঘাতের সম্ভাবনা তৈরি হয় কি না এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কতটা স্বচ্ছভাবে বিষয়টি পরিচালনা করেছে।
দুদকের অভিযোগের বিষয়ে আসিফ মাহমুদও প্রকাশ্যে আপত্তি জানিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন, তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই দুদকের বক্তব্যের ভিত্তিতে তাঁর বিরুদ্ধে ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ তৈরি হয়েছে। তিনি দুদকের বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবিও জানিয়েছেন এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন।
এর আগে সাবেক এপিএসের ঘটনা সামনে আসার সময় তিনি বলেছিলেন, তিনি নিজেই দুদককে তদন্তের অনুরোধ করেছেন এবং দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত যে-ই হোক, আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
ফলে এখন মূল প্রশ্ন হলো—দুদকের অনুসন্ধান শেষ পর্যন্ত কী ফল দেয়।
আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে বর্তমানে যে বিষয়গুলো সামনে এসেছে, তার মধ্যে নিয়োগ-বদলিতে অর্থ লেনদেন, টেন্ডার কমিশন, উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানো, বিদেশে অর্থ পাচার এবং সম্পদ অর্জনের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। দুদক এসবের কিছু বিষয়ে অনুসন্ধান করছে এবং নতুন অভিযোগও চলমান অনুসন্ধানে যুক্ত করেছে।
আসিফ মাহমুদের দায়িত্বকাল ছিল পরিবর্তন ও সংস্কারের প্রত্যাশায় ভরা একটি সময়। সেই সময়ের একজন গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টার বিরুদ্ধে এখন হাজার কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম ও বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগগুলো সত্য হলে তা শুধু তাঁর ব্যক্তিগত ভাবমূর্তির প্রশ্ন নয়—অন্তর্বর্তী সরকারের স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবস্থাপনার বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গেও জড়িত।
অন্যদিকে অভিযোগগুলো যদি তদন্তে মিথ্যা বা ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়, তাহলেও দ্রুত রাজনৈতিক ও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অভিযোগের কারণে একজন ব্যক্তির ভাবমূর্তির যে ক্ষতি হয়েছে, তার দায় নিয়েও প্রশ্ন উঠবে।
তাই এখন সবচেয়ে জরুরি হলো রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, নথি, ব্যাংক হিসাব, সম্পদের বিবরণ, প্রকল্পের কাগজপত্র, টেন্ডার প্রক্রিয়া এবং বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত শেষ করা।
দুদকের অনুসন্ধানই এখন নির্ধারণ করবে—এসব অভিযোগ কেবল রাজনৈতিক বিতর্ক, নাকি এর পেছনে রয়েছে বাস্তব আর্থিক অনিয়মের প্রমাণ।