বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ডান হাত হারিয়েও বাম হাতে লিখে এসএসসিতে জিপিএ-৪.৮৯, অর্নবের স্বপ্নজয়ের গল্প

বাবুল মিয়া, তাহিরপুর ( সুনামগঞ্জ)প্রতিনিধি 

একটি দুর্ঘটনা বদলে দিয়েছিল নবম শ্রেণির কিশোর অর্নবের জীবন। নবম শ্রেণির শুরতেই বৈদ্যুতিক লাইনে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে গুরুতর আহত হয়ে হারাতে হয়েছিল ডান হাত। দীর্ঘ তিন মাস ১০ দিন হাসপাতালের বিছানায় থেকে একের পর এক অস্ত্রোপচার ও অসহনীয় চিকিৎসার যন্ত্রণা সহ্য করেও হার মানেনি সে। শেষ পর্যন্ত বাম হাতে নতুন করে লেখা শিখে সেই অর্নবই এসএসসি-২০২৬ পরীক্ষায় জিপিএ-৪.৮৯ অর্জন করেছে।

অর্নব সুনামগঞ্জ জেলা যুবদলের সহ-দপ্তর সম্পাদক সামরুল ইসলামের ভাতিজা বলে জানা গেছে।

জানা যায়, অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় এক বন্ধুর সঙ্গে বাজি ধরে স্কুল ভবনের দ্বিতীয় তলার ছাদের রেলিং ধরে হাঁটছিল অর্নব। একপর্যায়ে পা পিছলে গেলে নিজেকে বাঁচাতে পাশের একটি তারের দিকে হাত বাড়ায় সে। কিন্তু সেটি ছিল উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বৈদ্যুতিক লাইন।

মুহূর্তেই বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে দু’দুবার আঘাত পেয়ে ছিটকে রাস্তায় পড়ে যায় অর্নব। শরীরের বিভিন্ন অংশ মারাত্মকভাবে ঝলসে যায়। প্রথমে উপজেলা হাসপাতাল ও পরে জেলা হাসপাতালে নেওয়া হলেও তার শারীরিক অবস্থা গুরুতর হওয়ায় দ্রুত বিভাগীয় হাসপাতালে পাঠানো হয়।

সেখানে শুরু হয় অর্নবের দীর্ঘ জীবন-মৃত্যুর লড়াই। প্রায় তিন মাস ১০ দিন হাসপাতালের বিছানায় থাকতে হয় তাকে। একের পর এক অস্ত্রোপচার, অসংখ্য ব্যাগ রক্ত এবং পুড়ে যাওয়া শরীরের ক্ষতস্থানের জটিল চিকিৎসার মধ্য দিয়ে যেতে হয় তাকে।

চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টার পরও শেষ পর্যন্ত রক্ষা করা সম্ভব হয়নি তার ডান হাতটি। যে হাত দিয়ে লিখে ভবিষ্যতে বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখত, সেই হাতটিই হারাতে হয় অর্নবকে।

দীর্ঘদিন অর্নব জানত না যে তার ডান হাতটি আর নেই। ব্যান্ডেজের ভেতরে আঙুল নাড়ানোর চেষ্টা করত সে। নাড়াতে না পারলে কাঁদত। পরে যখন জানতে পারে তার ডান হাতটি আর নেই, তখন কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে চারপাশ।

তবে এই কঠিন বাস্তবতার কাছে হার মানেনি অর্নব। বরং এখান থেকেই শুরু হয় তার নতুন লড়াই। বাম হাতে আবারও লেখা শেখে সে। হাতে তুলে নেয় বই-খাতা। নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করে।

সেই অর্নব এবার এসএসসি-২০২৬ পরীক্ষায় জিপিএ-৪.৮৯ অর্জন করেছে।

তার চাচা সামরুল ইসলাম বলেন এই ফলাফল শুধু একটি পরীক্ষার ফল নয়; এটি তার অদম্য সাহস, কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় ও স্বপ্নের কাছে ফিরে আসার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

অর্নব প্রমাণ করেছে—জীবনের পথে কোনো অঙ্গ হারিয়ে গেলেও স্বপ্ন হারিয়ে যেতে হয় না। শারীরিক সীমাবদ্ধতা মানুষকে থামিয়ে দিতে পারে, কিন্তু অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে প্রতিকূলতাকে জয় করে সামনে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।

অর্নবের এই সাফল্যে পরিবার, স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে আনন্দের সৃষ্টি হয়েছে। তার আগামী দিনের সুন্দর ও সফল ভবিষ্যতের জন্য সবার কাছে দোয়া কামনা করা হয়েছে।

অর্নবের গল্প যেন একটাই বার্তা দেয়—জীবনে যত বড় আঘাতই আসুক, ইচ্ছাশক্তি ও স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরে এগিয়ে গেলে জয় একদিন আসবেই।