মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাতে ফের পুরোনো পদ্ধতি, সিন্ডিকেট নিয়ে প্রশ্ন

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী পাঠাতে আবারও আগের পদ্ধতিতে ফিরছে বাংলাদেশ। মালয়েশিয়ার নির্ধারণ করে দেওয়া ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী পাঠানোর সিদ্ধান্ত ঘিরে এরই মধ্যে উঠেছে নানা প্রশ্ন। অতীতে একই ধরনের ব্যবস্থায় অতিরিক্ত অর্থ আদায়, প্রতিশ্রুত চাকরি ও বেতন না পাওয়া এবং কর্মীদের হয়রানির অভিযোগে তিন দফা বাংলাদেশিদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ হয়েছিল।

গত শুক্রবার মালয়েশিয়া সরকারের অনুমোদিত প্ল্যাটফর্ম এফডব্লিউসিএমএস বাংলাদেশের ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা প্রকাশ করেছে। একই দিনে নেপালেরও ২৫টি এজেন্সির তালিকা প্রকাশ করা হয়। তবে নেপাল এ পদ্ধতিতে আপত্তি জানিয়েছে। দেশটির শ্রমমন্ত্রী পরদিন মালয়েশিয়ার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূতকে ডেকে সব এজেন্সির জন্য আগের মতো কর্মী পাঠানোর সুযোগ রাখার দাবি জানান।

বাংলাদেশও মালয়েশিয়ার কাছে এজেন্সি বাছাইয়ের প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চিঠি দিয়েছে। প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, মালয়েশিয়ার দেওয়া শর্ত পূরণ করা ৪২৩টি এজেন্সির তালিকা পাঠানো হয়েছিল। এর মধ্যে আগের সিন্ডিকেটের কারণে লাইসেন্স বাতিল হওয়া ৪৯টি বাদ দেওয়ার পর বাকি ৩৭৪টির মধ্যে ২৫টি এজেন্সিকে তালিকায় রাখা হয়েছে। বাকি ৩৪৯টি এজেন্সিকেও অন্তর্ভুক্ত করতে বাংলাদেশ আগ্রহী।

অতীতেও একই পদ্ধতিতে বাজার বন্ধ

২০০৯ সালে প্রথমবার বাংলাদেশিদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ হয়। পরে ২০১৬ সালের শেষে বাজার খুললে মাত্র ১০টি এজেন্সিকে কর্মী পাঠানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়। ২০১৭ ও ২০১৮ সালে এসব এজেন্সির মাধ্যমে ৪ লাখ ৭৫ হাজার ৭৭৯ জন বাংলাদেশি মালয়েশিয়ায় যান।

জিটুজি প্লাস পদ্ধতিতে কর্মীপ্রতি ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩৭ হাজার টাকা। কিন্তু অভিযোগ ওঠে, কর্মীদের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছিল প্রায় তিন লাখ টাকা করে। প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগের পর ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে ওই পদ্ধতি বাতিল করে মালয়েশিয়া। বন্ধ হয়ে যায় বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ।

এরপর ২০২১ সালের ডিসেম্বরে দুই দেশ নতুন করে চুক্তি করে। সেই চুক্তিতেও কোন কোন রিক্রুটিং এজেন্সি কর্মী পাঠাবে, তা নির্ধারণের সুযোগ রাখা হয় মালয়েশিয়ার হাতে। পরে ২৫টি এজেন্সিকে কর্মী পাঠানোর জন্য বাছাই করে মালয়েশিয়া। এসব এজেন্সির বড় অংশের মালিক ছিলেন তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের নেতা, এমপি ও মন্ত্রীদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা।

পরে সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলসহ আরও ৭৬টি এজেন্সিকে কর্মী পাঠানোর সুযোগ দেওয়া হয়। ২০২২ সালের আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের ৩১ মে পর্যন্ত এ পদ্ধতিতে ৪ লাখ ৭৬ হাজার ৭৯০ জন কর্মী মালয়েশিয়ায় যান। কর্মীপ্রতি সরকারি ব্যয় নির্ধারিত ছিল ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকা।

তবে শ্রম অধিকার নিয়ে কাজ করা একটি ইউনিয়নের জরিপে দাবি করা হয়, কর্মীদের কাছ থেকে গড়ে ৫ লাখ ৪৪ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছিল।

ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগের মধ্যে ২০২৪ সালের ৩১ মে আবারও বাংলাদেশিদের জন্য শ্রমবাজার বন্ধ করে দেয় মালয়েশিয়া। এতে প্রায় ১৭ হাজার কর্মী সব প্রক্রিয়া শেষ করেও দেশটিতে যেতে পারেননি। এ ছাড়া লাখের বেশি কর্মী মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য টাকা দিয়ে অপেক্ষায় ছিলেন। শেষ সময়ে ঢাকা-কুয়ালালামপুর রুটের বিমানভাড়াও কয়েক গুণ বেড়ে যায়।

ফের কেন একই পদ্ধতি

আগের অভিজ্ঞতার পরও এবার পুরোনো পদ্ধতিতে কর্মী পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জনশক্তি ব্যবসায়ীরা। তাঁদের মতে, মালয়েশিয়ায় থাকা একটি প্রভাবশালী চক্রের শর্ত মেনে না নিলে দেশটির শ্রমবাজার খোলা কঠিন হয়ে পড়ে।

মালয়েশিয়ায় বিদেশি কর্মী নিয়োগের অনুমোদিত প্ল্যাটফর্ম বেস্টিনেট পরিচালনা করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী দাতো আমিনুল ইসলাম বিন আবদুর নূর। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এই মালয়েশীয় নাগরিকসহ প্রতিষ্ঠানটির আট কর্মকর্তাকে ২০২২ সালের আগস্টে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।

জনশক্তি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, আমিন নূরকে কেন্দ্র করে মালয়েশিয়ায় একটি সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। বাংলাদেশে সেই সিন্ডিকেটের হয়ে ক্যাথারসিস ইন্টারন্যাশনালের মালিক রুহুল আমিন স্বপন কাজ করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে রুহুল আমিন এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

সম্প্রতি আদালতে দাখিল করা অভিযোগপত্রেও রুহুল আমিন স্বপনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ থেকে কোন কোন এজেন্সি মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর সুযোগ পাবে, তা নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ আনা হয়েছে। এরই মধ্যে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় ক্যাথারসিস ইন্টারন্যাশনালের লাইসেন্স বাতিল করেছে।

নতুন করে উঠছে সিন্ডিকেটের অভিযোগ

অভিবাসন গবেষণা প্রতিষ্ঠান রামরুর চেয়ারপারসন ড. তাসনিম সিদ্দিকী মনে করেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে সিন্ডিকেটের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে। তাঁর মতে, বাংলাদেশসহ যেসব দেশের জন্য মালয়েশিয়া নির্দিষ্ট এজেন্সি বাছাই করেছে, সেসব দেশ সম্মিলিতভাবে আপত্তি জানালে মালয়েশিয়ার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।

এবার বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, কম্বোডিয়া ও ফিলিপাইনসহ কয়েকটি দেশের জন্যও নির্দিষ্ট এজেন্সি বাছাই করেছে মালয়েশিয়া। ফলে এ দেশগুলোকে সঙ্গে নিয়ে একটি স্বচ্ছ ও উন্মুক্ত নিয়োগব্যবস্থার দাবি তোলার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পুরোনো নিয়মে অন্তত ডিসেম্বর পর্যন্ত

নতুন কোনো চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত অন্তত ডিসেম্বর পর্যন্ত পুরোনো পদ্ধতিতেই বাংলাদেশ থেকে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া চলবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। মালয়েশিয়া থেকে কোনো কর্মীর চাহিদাপত্র চূড়ান্ত হলে এফডব্লিউসিএমএস সফটওয়্যারের মাধ্যমে তা অনুমোদিত এজেন্সিগুলোর মধ্যে বণ্টন করা হবে।

তবে এই ব্যবস্থার মধ্যেই ভিসা কেনাবেচা ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন জনশক্তি ব্যবসায়ী ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, আগের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার নিয়োগপ্রক্রিয়ায় পূর্ণ স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সব যোগ্য এজেন্সির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।

এদিকে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ২৫টি এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী পাঠানোর খবরে উদ্বেগ জানিয়েছে। পৃথক বিবৃতিতে দল দুটি পুরো প্রক্রিয়া উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ করার দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে কোন প্রক্রিয়ায় এজেন্সি বাছাই করা হয়েছে, তা প্রকাশেরও দাবি জানিয়েছে তারা।