শিগগিরই গ্যাসের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, আশা প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানের

শিগগিরই দেশের গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।

জাহেদ উর রহমান বলেন, গ্যাসের সরবরাহ এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। সম্প্রতি ক্ষতিগ্রস্ত ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) মেরামত করা হয়েছে। তবে বর্তমানে যে গ্যাসের কার্গো রয়েছে, সেটির সরবরাহে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। দ্রুত এ সমস্যা কাটিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

সাম্প্রতিক গ্যাস সংকটের জন্য শুধু বর্তমান সরকারের ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করা ঠিক হবে না বলেও মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। তিনি বলেন, এফএসআরইউতে দুর্ঘটনার কারণে কয়েক দিনের সংকট তৈরি হওয়া অনিবার্য ছিল। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে।

তবে সরকারের ব্যবস্থাপনায় কিছু অদক্ষতা বা সমস্যা থাকতে পারে বলে স্বীকার করেন তিনি। এসব বিষয় সরকার খতিয়ে দেখছে। কোথাও অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের বদলি করে নতুন কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়ার কথাও জানান তিনি।

সংকটের পেছনে একাধিক কারণ

বর্তমান গ্যাস সংকটকে বৈশ্বিক পরিস্থিতি, দীর্ঘদিনের দেশীয় জ্বালানি ব্যবস্থাপনার ঘাটতি এবং অর্থনীতির আকার বাড়ার সঙ্গে জ্বালানির চাহিদা বৃদ্ধির সম্মিলিত ফল হিসেবে দেখার আহ্বান জানান জাহেদ উর রহমান।

তিনি বলেন, দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট। বিপরীতে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ২৭০ থেকে ২৮০ কোটি ঘনফুটের মতো গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। অর্থনীতির আকার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানির চাহিদাও বাড়ছে। ফলে আগের ঘাটতির সঙ্গে নতুন চাহিদা যুক্ত হয়েছে।

জনগণের প্রতি পরিস্থিতি বিবেচনায় ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে সরকার আশাবাদী।

শিল্পে কিস্তিতে বিল পরিশোধের সুযোগ

শিল্পকারখানাগুলো সচল রাখতে গ্যাস ও বিদ্যুতের বিল এককালীন পরিশোধের পরিবর্তে ১২ মাসের কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

গ্যাসের ওপর চাপ কমাতে শিল্পকারখানায় ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক গ্যাস সাশ্রয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে আনার উদ্যোগ

ভোলার নতুন গ্যাসক্ষেত্র থেকে দ্রুত জাতীয় গ্রিডে গ্যাস যুক্ত করতে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে জরুরি পাইপলাইন নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই সম্পন্ন হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা।

তিনি বলেন, ভোলায় বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারযোগ্য গ্যাসের মজুত রয়েছে। এই গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে আনা হবে, নাকি এলএনজিতে রূপান্তর করে আনা হবে—এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বিদেশি গ্যাস আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে দেশীয় উৎস থেকে দৈনিক ১ হাজার ৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলনের লক্ষ্যে ১৫০টি কূপ খনন ও পুনঃখননের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে জোর

দেশে বিপুল পরিমাণ গ্যাসের সম্ভাব্য মজুত রয়েছে উল্লেখ করে জাহেদ উর রহমান বলেন, বিভিন্ন জরিপে দেশে ৪০ থেকে ৫০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট পর্যন্ত গ্যাস থাকার সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে। বর্তমানে দেশের বার্ষিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ১ দশমিক ৩ থেকে ১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। অর্থনীতির আকার বাড়ার সঙ্গে এই চাহিদা আরও বাড়বে।

স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধান দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার সমালোচনা করে তিনি বলেন, বর্তমান সংকট বহু বছরের পুঞ্জীভূত সমস্যার ফল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধানে প্রত্যাশিত উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

দ্বিগুণ হয়েছে এলএনজির দাম

আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম ব্যাপক বেড়ে যাওয়ায় গ্যাস সংকট মোকাবিলা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানান জাহেদ উর রহমান।

তিনি বলেন, গত বছরের একই সময়ে প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম ছিল ১২ থেকে ১৪ ডলার। বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ২৪ ডলারে দাঁড়িয়েছে। ভবিষ্যতে দাম ৩০ ডলার বা তারও বেশি হতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের সংকট এবং বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতির কারণে বেশি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর ইউরোপ এলএনজির বড় ক্রেতায় পরিণত হয়েছে। শীত মৌসুম সামনে রেখে ইউরোপীয় দেশগুলোও গ্যাসের মজুত বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

এ পরিস্থিতিতে বেশি দামে গ্যাস আমদানি করে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দেওয়া হবে, নাকি স্বল্পমেয়াদে কিছুটা লোডশেডিং মেনে নেওয়া হবে—সরকারকে এমন কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

কাতার-মালয়েশিয়ার সঙ্গে আলোচনা

গ্যাসের সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা।

তিনি জানান, গ্যাসের সরবরাহ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। কাতারের সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার ও ওমান থেকে আরও গ্যাস পাওয়ার বিষয়েও আলোচনা চলছে।

জাহেদ উর রহমান বলেন, সরকার আশা করছে ধীরে ধীরে গ্যাস পরিস্থিতি সহনীয় পর্যায়ে চলে আসবে। অর্থমন্ত্রীর দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, গ্যাস পরিস্থিতি ভালো অবস্থায় নিতে প্রায় দুই বছর সময় লাগতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে পুরো সময় পরিস্থিতি খারাপ থাকবে। বরং ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।

সারে ঘাটতি নেই

দেশে সারের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং সার নিয়ে কোনো ঘাটতি নেই বলেও জানান তিনি।

সার বিতরণ পরিস্থিতি তুলে ধরে জাহেদ উর রহমান বলেন, কোনো কোনো ডিলার তাঁদের জন্য বরাদ্দ করা সার উত্তোলন করছেন না। এ ধরনের কিছু ঘটনার কারণে কোনো কোনো এলাকায় সাময়িক সমস্যা তৈরি হচ্ছে। তবে এ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হবে না বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

আগামী দিনে খাদ্য উৎপাদন নিয়ে বিশ্বজুড়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে উল্লেখ করে তিনি ‘এল নিনো’র সম্ভাব্য প্রভাবের কথাও তুলে ধরেন। এসব অনিশ্চয়তা বিবেচনায় নিয়ে সরকার আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানান তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আন্দালিব রহমান এবং ইয়াসের খান চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।