তদন্তের আগে রায় নয়, রংপুরের চার প্রাণের হত্যার সত্য চাই

মোঃ মাইন উদ্দিন :

রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও ছোট ছেলে প্রীয়ম চক্রবর্তী- একই পরিবারের চারজন মানুষের হত্যাকাণ্ড শুধু পরিবারের শোক নয়- আমাদের আইনশৃঙ্খলা, তদন্তব্যবস্থা এবং সামাজিক বিবেকের জন্যও বড় এক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। চারটি জীবন একসঙ্গে নিভে যাওয়ার ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মনে নানা প্রশ্ন, উদ্বেগ ও সংশয় তৈরি হয়েছে।

পুলিশের বরাত দিয়ে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, গ্রেফতার দুই প্রতিবেশী তরুণ মাদক সেবনের উদ্দেশ্যে ওই বাড়ির ছাদে উঠেছিল এবং সিসিটিভি আছে বিষয়টি বুঝতে পেরে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে- এমন তথ্য সামনে এসেছে। তাঁদের স্বীকারোক্তির কথাও সংবাদমাধ্যমে এসেছে। কিন্তু একটি মামলায় গ্রেফতার বা স্বীকারোক্তি তদন্তের শেষ কথা হতে পারে না। আদালতে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ, ফরেনসিক আলামত, প্রত্যক্ষ ও পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য- সবকিছুর সমন্বয়েই সত্যের কাছে পৌঁছাতে হয়।

এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিহত তরুণীর মরদেহ নিয়ে নানা দাবি ও গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে। এমন দাবির সত্যতা কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত না হলে সেটিকে সত্য হিসেবে প্রচার করা যেমন অনুচিত, তেমনি একেবারে উড়িয়ে দেওয়াও তদন্তের স্বার্থে সমীচীন নয়। প্রয়োজন পেশাদার ফরেনসিক পরীক্ষা, প্রয়োজন হলে ডিএনএ বিশ্লেষণ এবং সংশ্লিষ্ট সব আলামতের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা। কারণ এই ধরনের ঘটনায় একটি ছোট আলামতও কখনো কখনো পুরো ঘটনার গতিপথ বদলে দিতে পারে।

সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো- তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুই ধরনের বয়ান শক্তিশালী হয়ে উঠছে। কেউ ঘটনাটিকে কেবল মাদককেন্দ্রিক অপরাধ হিসেবে চূড়ান্তভাবে দেখাতে চাইছেন, আবার কেউ এটিকে সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করতে শুরু করেছেন। অথচ কোনোটিই তদন্তের বিকল্প নয়। সত্যিই যদি মাদককেন্দ্রিক অপরাধ হয়, প্রমাণে সেটিই প্রতিষ্ঠিত হোক, অন্য কোনো কারণ বা উদ্দেশ্য থাকলে সেটিও নির্ভরযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে সামনে আসুক। অপরাধের পরিচয় অপরাধীর ধর্ম, বা সামাজিক অবস্থান দিয়ে নয়- প্রমাণ দিয়েই নির্ধারিত হওয়া উচিত। এবং এখানেই তদন্তকারী সংস্থার দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি।

চারজন মানুষ কেন নিহত হলেন, তাঁদের সঙ্গে কারও পূর্বশত্রুতা ছিল কি না, হত্যার পেছনে একক নাকি একাধিক উদ্দেশ্য ছিল, ঘটনাস্থলের সব আলামত যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও পরীক্ষা করা হয়েছে কি না, গ্রেফতার ব্যক্তিদের বক্তব্যের সঙ্গে বৈজ্ঞানিক প্রমাণের মিল আছে কি না- প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করতে হবে।

কারণ একটি হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে জনমতের চাপ যেমন তদন্তকে প্রভাবিত করা উচিত নয়, তেমনি কোনো নির্দিষ্ট তত্ত্বকে দ্রুত প্রতিষ্ঠা করার তাড়নাও থাকা উচিত নয়। তদন্তের কাজ হলো মানুষের ধারণাকে সত্যে পরিণত করা নয়, বরং সত্য কি, তা প্রমাণের মাধ্যমে বের করে আনা।

রংপুরের এই চারজনের মৃত্যু তাই কোনো রাজনৈতিক স্লোগান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুঞ্জন কিংবা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার উপাদান হতে পারে না। তাঁরা ছিলেন চারজন মানুষ, চারটি পরিবারিক সম্পর্কের কেন্দ্র, চারটি জীবন্ত অস্তিত্ব- যাঁদের হত্যার ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে।

এই হত্যাকাণ্ডের সত্য উদঘাটনে প্রয়োজন স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত তদন্ত। প্রয়োজন সব গুরুত্বপূর্ণ আলামতের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা এবং প্রয়োজন হলে ডিএনএসহ পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক বিশ্লেষণ। তদন্তে যার বিরুদ্ধে যতটুকু প্রমাণ পাওয়া যাবে, তার ভিত্তিতেই তার দায় নির্ধারিত হোক।

তদন্ত শেষ হওয়ার আগে রায় নয়- গুঞ্জনের আগে প্রমাণ, পরিচয়ের আগে সত্য এবং সন্দেহের আগে বিজ্ঞান। রংপুরের চার প্রাণের হত্যাকাণ্ডে আমাদের একটাই দাবি হওয়া উচিত- সত্য উদঘাটিত হোক, প্রকৃত অপরাধী শনাক্ত হোক এবং আইনের সর্বোচ্চ কাঠামোর মধ্যে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হোক।