প্রকাশ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সময়: ০৬:২৬ পিএম
কুলিয়ারচরে জব্দকৃত আলোচিত ১৯.৫ টন সরকারি চাল নিলামে বিক্রি: তদন্তে সত্যতা মিলতেই ডিলারশিপ বাতিল
মোঃ মাইন উদ্দিন, কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি:
দীর্ঘ তদন্ত, নানা জটিলতা ও চাল সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগকে ঘিরে ব্যাপক আলোচনার পর অবশেষে কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে কুঁড়ার মিল থেকে জব্দ হওয়া সরকারি খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ১৯ দশমিক ৫ টন চাল উন্মুক্ত নিলামে বিক্রি করেছে উপজেলা প্রশাসন। একই সাথে এই ঘটনায় অভিযুক্ত ডিলারের ওএমএস ডিলারশিপ বাতিল করা হয়েছে এবং তার গচ্ছিত জামানতও বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।
জানা যায়, সোমবার বিকেলে কুলিয়ারচর সরকারি খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি-এলএসডি) কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত উন্মুক্ত নিলামে চারজন দরদাতা অংশ নেন। প্রতি টন ১১ হাজার ২০০ টাকা দরে সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে স্থানীয় মোঃ সেলিম মিয়া ১৯ দশমিক ৫ টন চাল কিনে নেন। এতে সরকারের প্রাপ্তি হয়েছে ২ লাখ ১৮ হাজার ৪০০ টাকা, যা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ মে পৌর শহরের খরকমারা এলাকায় জিল্লু মিয়ার একটি কুঁড়ার মিলে অভিযান চালিয়ে সরকারি খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির শতাধিক বস্তা চাল জব্দ করা হয়। অভিযানের সময় মিলটি সিলগালা করে দেয় প্রশাসন। সরকারি কর্মসূচির চাল কিভাবে একটি বেসরকারি কুঁড়ার মিলে পৌঁছাল এবং সেখানে কেন মজুত রাখা হয়েছিল- এ প্রশ্নকে কেন্দ্র করেই শুরু হয় তদন্ত।
ঘটনার তদন্তে প্রথমে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মর্জিনা আক্তারকে প্রধান করে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তবে তদন্ত প্রতিবেদনের কয়েকটি বিষয়ে অস্পষ্টতা থাকায় প্রশাসন দ্বিতীয় দফায় আরও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ আদনান আখতারের নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের ওই কমিটি পুনরায় বিষয়টি অনুসন্ধান করে।
দ্বিতীয় তদন্তে সরকারি খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাল অবৈধভাবে মজুত রাখার বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় আইন অনুযায়ী জব্দ করা চাল নিলামে বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয় উপজেলা প্রশাসন। পাশাপাশি অভিযুক্ত ডিলারের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হয়।
এ ঘটনায় তদন্ত চলাকালেই তৈরি হয় নতুন চাঞ্চল্য। সিলগালাকৃত মিল থেকে গোপনে ট্রাকযোগে চাল সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে- এমন খবর ছড়িয়ে পড়লে উপজেলা প্রশাসন দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে চালগুলো পুনরায় জব্দ করে।
পরে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, দীর্ঘদিন মিলটি বন্ধ থাকায় জব্দ করা চাল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। বস্তায় আলো-বাতাসের ব্যবস্থা এবং পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে চাল রক্ষায় আইন অনুযায়ী নির্ধারিত ব্যক্তির জিম্মায় মিলের চাবি দেওয়া হয়েছিল। তবে চাল মিল থেকে সরিয়ে নেওয়ার কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি।
নিলাম কার্যক্রম পরিচালনার জন্য উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক উজ্জ্বল কুমার দত্তকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মোঃ দেলোয়ার হোসেন এবং উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা মোঃ শহীদুল ইসলাম। তাঁদের ব্যবস্থাপনাতেই সোমবার উন্মুক্ত নিলাম অনুষ্ঠিত হয়।
নিলামে মোঃ সেলিম মিয়া, মোঃ সেতু মিয়া, বাসির মেম্বার ও শফিকুল ইসলাম অংশ নেন। সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে মোঃ সেলিম মিয়ার কাছেই বিক্রি করা হয় জব্দকৃত চাল।
নিলাম কার্যক্রমে পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোঃ শাহাদৎ হোসেন শাহ আলম, উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ ফারুকুল ইসলাম ফারুক, খাদ্যগুদামের পরিদর্শক রাসেদা খাতুন, সালুয়া, রামদী, ফরিদপুর, গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর ও উছমানপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এবং প্যানেল চেয়ারম্যানসহ স্থানীয় সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
উপজেলা প্রশাসন সাংবাদিকদের জানিয়েছে, সরকারি খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাল অবৈধভাবে মজুত রাখার অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হওয়ায় অভিযুক্ত জিল্লুর ওএমএস ডিলারশিপ বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে তার গচ্ছিত জামানতও বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।
সরকারি খাদ্যশস্য নিয়ে অনিয়মের এ ঘটনায় দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয়ভাবে নানা আলোচনা চললেও শেষ পর্যন্ত তদন্তের ভিত্তিতে চাল নিলামে বিক্রি এবং ডিলারশিপ বাতিলের সিদ্ধান্তে ঘটনার একটি প্রশাসনিক পরিণতি ঘটল। তবে সরকারি কর্মসূচির চাল কিভাবে কুঁড়ার মিলে পৌঁছেছিল এবং এর সঙ্গে আর কেউ জড়িত ছিল কি না- সেসব প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ জবাব সংশ্লিষ্ট তদন্ত ও প্রশাসনিক নথিতে স্পষ্ট হওয়া জরুরি ছিল বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।