মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার এখন বেশ সহজ। তবে এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে যাচাইহীন তথ্য ছড়ানো, ভুক্তভোগীর পরিচয় প্রকাশ এবং ঘটনাকে ভিন্নভাবে উপস্থাপনের অভিযোগ উঠেছে মানিকগঞ্জের সিংগাইরে কয়েকজন কনটেন্ট নির্মাতার বিরুদ্ধে। সাম্প্রতিক তিনটি ঘটনাকে ঘিরে স্থানীয়ভাবে আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় সাংবাদিক ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, অনলাইনে বেশি ভিউ ও জনপ্রিয়তা অর্জনের প্রতিযোগিতায় কিছু ক্ষেত্রে তথ্যের সত্যতা যাচাই এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়টি উপেক্ষিত হচ্ছে। এর ফলে ভুক্তভোগী পরিবার বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ছে, পাশাপাশি জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে।
সিংগাইর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাজহারুল ইসলাম বলেন, কিছু কনটেন্ট নির্মাতা ভিউ বাড়ানোর জন্য দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে তথ্য প্রচার করছেন। তাঁর ভাষ্য, “এরা অপসাংবাদিকতা করে থাকে। ভিউ বাড়ানোর জন্য এমন জঘন্য কাজ করেছে। এরা মোটেও সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতা জানেন না।” বিশেষ করে স্কুলছাত্রী মারিয়া মাহির মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রচারিত বিভিন্ন তথ্য নিয়ে পুলিশ বিব্রত হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তিনটি ঘটনা ঘিরে বিতর্ক-
1. ধর্ষণের অভিযোগের ঘটনায় পরিচয় প্রকাশ:
সিংগাইরে ২৩ বছর বয়সী এক নারীকে ধর্ষণের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মামলার এজাহার অনুযায়ী, গত ২১ সেপ্টেম্বর রাতে বলধারা ইউনিয়নে এ ঘটনা ঘটে। পরে ২৪ সেপ্টেম্বর ভুক্তভোগী নিজে বাদী হয়ে থানায় মামলা করেন।
অভিযোগ উঠেছে, কয়েকজন ইউটিউবার ও কনটেন্ট নির্মাতা ওই নারীর পরিচয় প্রকাশ করে ভিডিও প্রচার করেছেন। এমনকি তাঁর আত্মীয়স্বজন ও শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের পরিচয় এবং সাক্ষাৎকারও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের ঘটনায় ভুক্তভোগীর পরিচয় প্রকাশ তাঁর ব্যক্তিগত মর্যাদা ও পারিবারিক জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই যৌন সহিংসতার ঘটনা প্রচারের ক্ষেত্রে পরিচয় গোপন রাখা এবং তথ্য যাচাই করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
2. আহত যুবককে মৃত ঘোষণার অভিযোগ
সিংগাইরের ধল্লা ইউনিয়নে শহিদুল ইসলাম (২২) নামের এক যুবকের ওপর হামলার ঘটনায় হত্যাচেষ্টার মামলা হয়েছে। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, গত ৬ সেপ্টেম্বর রাতে পূর্ববিরোধের জেরে তাঁর ওপর হামলা চালানো হয়। এতে শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাত পেলে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
এ ঘটনায় অভিযোগ উঠেছে, কয়েকজন কনটেন্ট নির্মাতা ওই যুবক চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় তাঁকে মৃত ঘোষণা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করেন। পরে আহতের স্বজনদের বিরুদ্ধে অভিযুক্তদের বাড়িঘরে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পাল্টাপাল্টি মামলার কথাও জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, হাসপাতাল বা নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে নিশ্চিত না হয়ে কারও মৃত্যুর খবর প্রচার করলে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ও উত্তেজনা সৃষ্টি হতে পারে।
3. মারিয়া মাহির মৃত্যু নিয়ে নানা প্রশ্ন
সিংগাইরের সাহরাইল উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মারিয়া মাহির (১৪) মৃত্যুর ঘটনাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ জুন বিদ্যালয় থেকে ফেরার পর সে নিখোঁজ হয়। ছয় দিন পর, ২১ জুন, চন্দননগর এলাকার একটি কবরস্থানসংলগ্ন স্থান থেকে গাছের ডালে ঝুলন্ত অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় তার মা হত্যা মামলা করেন। মামলায় শিক্ষক, সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীসহ মোট নয়জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনাটি নিয়ে শুরু থেকেই নানা বক্তব্য ও দাবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। নিহতের পরিবার হত্যার অভিযোগ করে আসছে। অন্যদিকে, ময়নাতদন্ত ও তদন্তের বিভিন্ন তথ্যকে কেন্দ্র করে আত্মহত্যার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। মামলার আসামিরা জামিনে মুক্তি পেয়েছেন এবং অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বলেও জানা গেছে।
এ ঘটনায় প্রকৃত তথ্য তুলে ধরতে তদন্তের নির্ভরযোগ্য ফলাফল ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
সাংবাদিকতা নাকি শুধু কনটেন্ট তৈরি?
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে এলাকায় মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। স্থানীয় সাংবাদিকদের অভিযোগ, কিছু কনটেন্ট নির্মাতা পেশাগত সাংবাদিকতার মৌলিক নিয়ম অনুসরণ না করেই সংবেদনশীল ঘটনা নিয়ে ভিডিও তৈরি ও প্রচার করছেন।
সিংগাইর প্রেসক্লাবের সভাপতি ও দৈনিক নয়াদিগন্তের প্রতিনিধি মো. সোহরাব হোসেন বলেন, মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করলেই কাউকে সাংবাদিক বলা যায় না। সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করা জরুরি।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, কিছু কনটেন্ট নির্মাতা রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে প্রাধান্য পাচ্ছেন। তাঁদের প্রকাশিত কিছু ভিডিও ও পোস্টের কারণে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
প্রযুক্তির সহজলভ্যতায় এখন যে কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য ও ভিডিও প্রকাশ করতে পারেন। তবে সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে সত্যতা যাচাই, নিরপেক্ষতা, দায়িত্বশীলতা ও মানুষের ব্যক্তিগত মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রাখা অপরিহার্য।
বিশেষজ্ঞ ও সাংবাদিকদের মতে, জনপ্রিয়তা কিংবা ভিউয়ের প্রতিযোগিতায় যাচাইহীন তথ্য ছড়ানো থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সংবেদনশীল ঘটনায় ভুক্তভোগীর পরিচয় গোপন রাখা এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য যাচাই করে সংবাদ প্রকাশ করাই হওয়া উচিত দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার মূলনীতি।