বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের গাজীপুরের ভাওয়াল রেঞ্জের আওতাধীন ভবানীপুর বিট এলাকায় আবারও প্রকাশ্যে শুরু হয়েছে সংঘবদ্ধ বনভূমি দখল বাণিজ্য। ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর বনাঞ্চলে যে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, তা এখনো থামেনি। বরং বন বিভাগের রহস্যজনক নীরবতায় দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে দখলদার সিন্ডিকেট। বনের জমি রক্ষায় একাধিকবার যৌথ বাহিনীর মাধ্যমে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হলেও হঠাৎ করেই এসব অভিযান বন্ধ হয়ে যায়। এর সুযোগে ৫ আগস্টেরগ পর দখল হওয়া বনভূমি এখনো উদ্ধার না হওয়ায় নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে সংঘবদ্ধ দখলচক্র।
বিশেষ করে এ বিটের ভবানীপুর, বানিয়াচালা ও শিরিরচালা এলাকায় দিনের আলোতেই বনভূমি দখল করে দোকান ও বসতঘর নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব অবৈধ নির্মাণকাজে বিট অফিসের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রত্যক্ষ মদদ ও আর্থিক লেনদেন জড়িত। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সমন্বয় না করে নির্মাণকাজ চালাতে গেলে বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে। এমনকি ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে।স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রভাবশালী একটি দখলদার সিন্ডিকেট পুরো এলাকায় আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। বন বিভাগের দুর্বল তদারকি ও রহস্যজনক নীরবতার সুযোগে তারা নির্বিঘ্নে বনভূমি দখল ও স্থাপনা নির্মাণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
সরেজমিনে ভবানীপুর বিট এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ভবানীপুর বাজারের মসজিদ গলিতে মার্কেট নির্মাণের কাজ করছেন ফজলুল হকের ছেলে লিখন, সিদ্দিক ও মিলন কসাইসহ আরও কয়েকজন। অথচ বছরখানেক আগেই ওই এলাকায় যৌথ বাহিনীর সহায়তায় বন বিভাগ উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেছিল। ভবানীপুর মধ্যপাড়া এলাকায় ব্যাংকার কাদিরের বাড়ির সামনে দুই কক্ষবিশিষ্ট একটি দোকানঘর নির্মাণ করেছেন সাইফুল ইসলাম ড্রইং নামে এক ব্যক্তি। একই এলাকায় কাদির কসাই নামে আরেক ব্যক্তি নির্মাণ করেছেন এক কক্ষবিশিষ্ট একটি টিনশেড ঘর।এ ছাড়া ভবানীপুর বাজারের পূর্ব পাশে সাফারি হোটেলের পেছনে সিএস ১৪০৫ নম্বর দাগে ঘর নির্মাণ করছেন জাহাঙ্গীর ভূঁইয়া। কিছুদিন আগেই ওই স্থানে রেঞ্জ কর্মকর্তার উপস্থিতিতে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিল।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ভবানীপুর বাজার এলাকায় বনভূমিতে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে খালেক নামে এক ব্যক্তি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেন। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তিনি এসব কাজ করিয়ে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিট সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁর সমন্বয় রয়েছে বলেও স্থানীয়দের দাবি। এ ছাড়া ফিনিক্স হ্যাচারিসংলগ্ন আরএস ২৬৯৯ নম্বর দাগে জাহাঙ্গীর মুক্তার দীর্ঘদিন ধরে একের পর এক পাকা ভবন নির্মাণ করে আসছেন। তবে এসব নির্মাণকাজের বিরুদ্ধে বন বিভাগের পক্ষ থেকে কোনো বাধা দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
এ বিষয়ে ভবানীপুর বিট কর্মকর্তা নাছির উদ্দীন বার্তা বিচিত্রা কে জানান , "এগুলো বিভিন্ন সমস্যাপূর্ণ জায়গা। বিভিন্ন সময়ে তাদের প্রতিহত করার চেষ্টা করা হয়েছে। তারপরও আমি বিষয়গুলো দেখব।"রাজেন্দ্রপুর ভাওয়াল রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা মোজাম্মেল হককে বিষয়টি জানানো হলে তিনি ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন। তবে আশ্বাস দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এ অবস্থায় পরিবেশবিদ ও সচেতন মহল গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছেন, অবিলম্বে কঠোর অভিযান চালিয়ে অবৈধ দখল উচ্ছেদ, দখলদারদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং জড়িত বন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না হলে অচিরেই ভাওয়ালের গুরুত্বপূর্ণ বনভূমি স্থায়ীভাবে ধ্বংস হয়ে যাবে।তাঁরা দ্রুত প্রধান বন সংরক্ষক, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।