সাম্প্রতিক এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল দেশজুড়ে এক গভীর আলোচনার জন্ম দিয়েছে। চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার নেমে এসেছে ৫২.৫৭ শতাংশে এবং বরিশাল বোর্ডে তা দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪৪.৮৮ শতাংশে। বিজ্ঞান বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ শাখায় জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়াসহ সামগ্রিক ফলাফলের এই অবনতি আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা, পাঠদান পদ্ধতি এবং পরীক্ষা ও মূল্যায়ন কাঠামোকে নতুন করে পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছে। তবে এই ফল বিপর্যয়ের দায় কেবল পরীক্ষার্থীদের অমনোযোগিতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা ডিভাইস আসক্তির ওপর চাপিয়ে দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। বরং এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের শিখন ঘাটতি, মুখস্থনির্ভর শিক্ষাসংস্কৃতি, বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষকের অভাব এবং মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তনের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির অসামঞ্জস্য।
এবারের ফলাফলে আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অভিন্ন প্রশ্নপত্রের পাশাপাশি উত্তরপত্র মূল্যায়নে প্রশ্নভিত্তিক নমুনা উত্তর ও নির্ধারিত নম্বর বণ্টন নির্দেশিকা বা রুব্রিক্স (Rubrics)-এর প্রয়োগ। এতদিন অনেক ক্ষেত্রে উত্তরপত্র মূল্যায়নে পরীক্ষকের ব্যক্তিগত বিবেচনা, নম্বর প্রদানের শিথিলতা কিংবা প্রচলিত উদারতার প্রভাব ছিল। বিশেষ করে ব্যবহারিক পরীক্ষায় যথাযথ দক্ষতা যাচাই ছাড়াই নম্বর প্রদানের প্রবণতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন উঠেছে। নির্ধারিত মানদণ্ড অনুসরণ করে উত্তরপত্র মূল্যায়ন এবং ব্যবহারিক পরীক্ষায় নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রে অধিকতর নিয়ন্ত্রণ আরোপের ফলে এবার শিক্ষার্থীদের প্রকৃত জ্ঞান, অনুধাবন ও দক্ষতার ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এখানে রুব্রিক্সের বিষয়টি বিশেষভাবে বোঝা জরুরি। রুব্রিক্স মূলত এমন একটি মানদণ্ডভিত্তিক মূল্যায়ন পদ্ধতি, যেখানে একটি প্রশ্নের উত্তরে কী কী বিষয় থাকা প্রয়োজন, কোন পর্যায়ের উত্তরের জন্য কত নম্বর প্রাপ্য এবং শিক্ষার্থীর জ্ঞান ও দক্ষতা কীভাবে মূল্যায়িত হবে, তা আগে থেকেই নির্ধারিত থাকে। এর ফলে মূল্যায়নে ব্যক্তিনির্ভরতা কমে, পরীক্ষকদের মধ্যে নম্বর প্রদানের সামঞ্জস্য বাড়ে এবং শিক্ষার্থীর প্রকৃত অর্জন নির্ণয় সহজ হয়। সুতরাং রুব্রিক্স নিজেই কোনো ফল বিপর্যয়ের কারণ কিংবা ত্রুটিপূর্ণ পদ্ধতি নয়; বরং এটি দীর্ঘদিনের মূল্যায়নগত অসংগতি ও শিখন ঘাটতিকে দৃশ্যমান করে তোলার একটি বিজ্ঞানসম্মত উপায়। তবে প্রশ্ন হলো, যে শিক্ষাব্যবস্থা দীর্ঘদিন শিক্ষার্থীদের এই ধরনের মানদণ্ডভিত্তিক মূল্যায়নের উপযোগী করে গড়ে তুলতে পারেনি, সেখানে হঠাৎ কঠোর মূল্যায়ন চালু করলে তার প্রভাব কতটা প্রত্যাশিত হবে?
প্রকৃত সংকটের শিকড় আমাদের শিক্ষণ ও পঠনপদ্ধতির কাঠামোগত দুর্বলতার মধ্যে নিহিত। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ পাঠ্যবই বুঝে পড়ার পরিবর্তে পরীক্ষায় বেশি নম্বর পাওয়ার উদ্দেশ্যে মুখস্থনির্ভর প্রস্তুতিতে অভ্যস্ত হয়েছে। শ্রেণিকক্ষে প্রশ্ন করা, যুক্তি দিয়ে উত্তর দেওয়া, বিশ্লেষণ করা, নিজের ভাষায় লিখতে পারা এবং অর্জিত জ্ঞান বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার চর্চা পর্যাপ্তভাবে গড়ে ওঠেনি। ফলে শিক্ষার্থীরা পরিচিত প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করে লিখতে পারলেও প্রশ্নের ধরন বা উপস্থাপনা সামান্য পরিবর্তিত হলে অনেকেই কাঙ্ক্ষিত উত্তর দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। বিশেষ করে ইংরেজি ও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির মতো মৌলিক বিষয়ে এই শিখন ঘাটতি আরও প্রকট।
বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষকের অভাবও এই সংকটের অন্যতম কারণ। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইংরেজি বিষয়ে পর্যাপ্ত যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক না থাকা, আইসিটি বিষয়ে প্রশিক্ষিত শিক্ষকের সংকট এবং প্রয়োজনীয় কম্পিউটার ল্যাব ও ডিজিটাল উপকরণের অপ্রতুলতা শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিখন থেকে বঞ্চিত করছে। শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত না করে কেবল পরীক্ষার মানদণ্ড কঠোর করলে প্রত্যাশিত শিক্ষার মান অর্জন সম্ভব নয়। কারণ মূল্যায়নের আগে নিশ্চিত করতে হবে, শিক্ষার্থীরা যথাযথভাবে শেখার সুযোগ পেয়েছে কি না।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তনের সঙ্গে পাঠদান পদ্ধতির সামঞ্জস্য থাকা। শ্রেণিকক্ষে যদি শিক্ষার্থীকে বিশ্লেষণ, যুক্তি, সৃজনশীল চিন্তা ও সমস্যা সমাধানের অনুশীলন না করানো হয়, তাহলে পরীক্ষার খাতায় হঠাৎ এসব দক্ষতার প্রতিফলন প্রত্যাশা করা যায় না। রুব্রিক্সের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর প্রকৃত সক্ষমতা যাচাই করতে হলে শিক্ষাবর্ষজুড়ে পাঠদান ও মূল্যায়নেও একই ধরনের মানদণ্ড অনুসরণ করতে হবে। অর্থাৎ পরীক্ষার কয়েক ঘণ্টার মূল্যায়ন নয়, বরং প্রতিদিনের শ্রেণিকক্ষের শিখনপ্রক্রিয়াকেও মানসম্মত করতে হবে।
তাই সাম্প্রতিক ফল বিপর্যয়কে কেবল শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একই সঙ্গে শিক্ষক প্রস্তুতি, পাঠ্যক্রম, শ্রেণিকক্ষের পাঠদান, পরীক্ষা গ্রহণ এবং মূল্যায়ন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন। জিপিএ-৫ অর্জনের প্রতিযোগিতাকে শিক্ষার একমাত্র সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করার সংস্কৃতি থেকেও বেরিয়ে আসতে হবে। শিক্ষার প্রকৃত সাফল্য কেবল ভালো ফলাফল নয়; বরং একজন শিক্ষার্থী কতটুকু বুঝতে পারছে, নিজের চিন্তা প্রকাশ করতে পারছে, যুক্তি বিশ্লেষণ করতে পারছে এবং অর্জিত জ্ঞান বাস্তব জীবনে কাজে লাগাতে পারছে—তার মধ্যেই শিক্ষার প্রকৃত মান নিহিত।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ ও বিদ্যমান শিক্ষকদের কার্যকর প্রশিক্ষণ। পাশাপাশি ইংরেজি ও আইসিটি শিক্ষার মানোন্নয়ন, পর্যাপ্ত ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন, শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক দক্ষতা বিকাশ এবং শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত গাঠনিক মূল্যায়ন (Formative Assessment) চালু করতে হবে। শিক্ষকদের রুব্রিক্স প্রণয়ন ও প্রয়োগ সম্পর্কে বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণ দিতে হবে, যাতে তাঁরা শিক্ষাবর্ষের শুরু থেকেই শিক্ষার্থীদের নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী প্রস্তুত করতে পারেন। একই সঙ্গে অভিভাবক, শিক্ষক ও শিক্ষা প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগে মুখস্থনির্ভরতার পরিবর্তে অনুধাবন, বিশ্লেষণ, সৃজনশীলতা ও বাস্তব দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।
সাম্প্রতিক ফল বিপর্যয় আমাদের জন্য নিঃসন্দেহে একটি সতর্কবার্তা। তবে এই ফলাফলকে শুধু হতাশা, সমালোচনা কিংবা শিক্ষার্থীদের ওপর দোষ চাপানোর উপলক্ষ হিসেবে দেখলে মূল সমস্যার সমাধান হবে না। বরং এটিকে শিক্ষাব্যবস্থার গভীর দুর্বলতা শনাক্ত ও সংস্কারের একটি সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, মূল্যায়ন পদ্ধতি আধুনিক হলেই শিক্ষার মান আধুনিক হয়ে যায় না; তার জন্য প্রয়োজন মানসম্মত পাঠদান, দক্ষ শিক্ষক, পর্যাপ্ত শিক্ষা উপকরণ এবং শিক্ষার্থীর প্রকৃত শিখন নিশ্চিত করা।