বাবা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাঁকে বাঁচানোর আশায় স্বজনেরা বারবার ছুটছেন এদিক-সেদিক। ডাকছেন নার্সকে। কিন্তু অভিযোগ, সময়মতো সাড়া মেলেনি। একপর্যায়ে বাবার মৃত্যু হলো। আর সেই বাবার মরদেহ সামনে রেখে মেয়ে নিগার সুলতানা যখন চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ তুললেন, তখন তাঁর অভিযোগের জবাব দেওয়ার পরিবর্তে তাঁকে এবং তাঁর মা ও স্বামীকে হামলার শিকার হতে হয়েছে। একজন মেয়ের জন্য এর চেয়ে বেদনাদায়ক পরিস্থিতি আর কি হতে পারে!
কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার ভাগলপুরে অবস্থিত জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ঘটে যাওয়া হামলার ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। যা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। ভিডিওতে লেখা নিগার সুলতানার বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর বাবা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। মৃত্যুর আগে তিনি বারবার নার্সকে ডাকলেও যথাসময়ে সাড়া পাননি। চিকিৎসক ও নার্সদের অবহেলার কারণেই তাঁর বাবার মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। বাবার মৃত্যুর পর সেই অভিযোগ জানাতে গিয়ে তিনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা হামলার শিকার হয়েছেন বলেও দাবি করেন। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
একজন মানুষ যখন হাসপাতালে প্রিয়জনকে নিয়ে যান, তখন তাঁর মনে একটাই প্রত্যাশা থাকে, চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরবেন। কিন্তু সেই মানুষটি যখন হাসপাতালের বিছানায় শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন, তখন পরিবারের সদস্যদের মানসিক অবস্থা সহজেই অনুমেয়। এমন পরিস্থিতিতে স্বজনেরা চিকিৎসা নিয়ে প্রশ্ন তুলতেই পারেন। জানতে চাইতে পারেন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা যথাসময়ে দেওয়া হয়েছিল কি না। তাঁদের অভিযোগের জবাব দেওয়া হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। কোনো অভিযোগের জবাব হামলা, ভয়ভীতি কিংবা অপমানের মাধ্যমে দেওয়া যায় না।
অন্যদিকে, ঘটনার একদিন পর হাসপাতালের নার্স ও নিরাপত্তাকর্মীরাও নার্সের ওপর হামলার অভিযোগ তুলে মানববন্ধন করেছেন। ‘নার্সের ওপর হামলা কেন, বিচার চাই’ স্লোগানে তাঁরা নিজেদের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের অভিযোগও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ চিকিৎসক, নার্স ও হাসপাতালের অন্য কর্মীরাও নিরাপদ পরিবেশে দায়িত্ব পালনের অধিকার রাখেন। রোগী ও স্বজনদের নিরাপত্তা যেমন জরুরি, তেমনি চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। কোনো পক্ষের অভিযোগকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে অন্য পক্ষের বক্তব্য উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
এখন সবচেয়ে জরুরি হলো, পুরো ঘটনার নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত। চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ কতটা সত্য, রোগীর স্বজনদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে কি না এবং নার্সের ওপর হামলার অভিযোগের পেছনে কি- সবকিছুই খতিয়ে দেখতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর পাশাপাশি ঘটনার আগের ও পরের পরিস্থিতি, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, হাসপাতালের চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। শুধু একটি ভিডিও দেখে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যেমন সমীচীন নয়, তেমনি অভিযোগ উঠেছে- তা উপেক্ষা করারও সুযোগ নেই।
হাসপাতাল মানুষের চিকিৎসা ও সেবা পাওয়ার জায়গা। সেখানে রোগী ও স্বজনেরা সম্মানজনক আচরণ পাওয়ার অধিকার রাখেন। একইভাবে চিকিৎসাকর্মীদেরও মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। চিকিৎসায় অবহেলা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহি করতে হবে। আবার কারও বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাঁর বিরুদ্ধেও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। কারও পেশাগত পরিচয় কিংবা পদমর্যাদা তাঁকে জবাবদিহির ঊর্ধ্বে রাখতে পারে না।
জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এই ঘটনা চিকিৎসাসেবায় মানবিক আচরণের গুরুত্বও নতুন করে সামনে এনেছে। চিকিৎসাসেবা শুধু ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা কিংবা ব্যবস্থাপত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রোগী ও স্বজনদের কথা শোনা, তাঁদের উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়া এবং বিপদের সময় পাশে দাঁড়ানোও চিকিৎসাসেবার অবিচ্ছেদ্য অংশ। একজন স্বজন যখন প্রিয় মানুষকে হারিয়ে অভিযোগ জানান, তখন তাঁর প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ প্রত্যাশিত। একই সঙ্গে চিকিৎসাকর্মীদের সম্মান এবং নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে।
নিগার সুলতানা বাবাকে বাঁচানোর আশায় হাসপাতালে গিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাবাকে হারিয়েছেন। এরপর তাঁর অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের আগেই যদি তিনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা হামলার শিকার হয়ে থাকেন, তবে সেটিও তদন্তের বিষয়। অন্যদিকে, নার্সের ওপর হামলার অভিযোগও কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যাবে না। দুই পক্ষের বক্তব্য ও অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা সামনে আনতে হবে। দোষী যে পক্ষই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনা জরুরি।
হাসপাতাল কারও ক্ষমতা প্রদর্শনের জায়গা নয়, এটি মানুষের বিপদে ভরসা পাওয়ার শেষ আশ্রয়। তাই জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এ ঘটনায় আবেগ, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা নয়, নিরপেক্ষ তদন্তের ভিত্তিতেই প্রকৃত সত্য উদঘাটন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণই হোক সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।