ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনা নিরসনে আলোচনায় অগ্রগতির ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দীর্ঘ আট মাসের সংঘাতের পুনরাবৃত্তি এড়াতে কূটনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে, ইরানও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিবিড় আলোচনা চালানোর কথা জানিয়েছে। একই সঙ্গে কঠোর কিছু শর্তে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে তেহরান।
সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি হতে পারে। তেহরান যত দ্রুত সম্ভব সমঝোতায় পৌঁছাতে চায় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে কূটনৈতিক উদ্যোগের পাশাপাশি নতুন করে সামরিক উত্তেজনার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালিয়েছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরানের বিরুদ্ধে গোপনে পরিচালিত সীমিত হামলাগুলোর মধ্যে এটি সর্বশেষ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে অবস্থিত কেশম দ্বীপে অল্প সময়ের ব্যবধানে পরপর পাঁচটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এর আগে সংঘাতের অবসানের সম্ভাবনায় সোমবার বিশ্ববাজারে তেলের দাম ৭ শতাংশের বেশি কমে যায়।
মধ্যস্থতায় কাতার ও পাকিস্তান
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি জানিয়েছেন, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনা চলছে। এ ক্ষেত্রে কাতার ও পাকিস্তান সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, চুক্তিতে পৌঁছানোর বিষয়ে তিনি ও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আশাবাদী। সোমবার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, আলোচনায় কিছু অগ্রগতি হয়েছে। আরও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা চলছে।
সম্ভাব্য নতুন আলোচনার বিষয়ে ভ্যান্স ইরানের জাতীয় নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজায়িকে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন বলেও জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস। কয়েক মাসের মধ্যে দুই দেশের মধ্যে এটি সর্বোচ্চ পর্যায়ের কূটনৈতিক উদ্যোগ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এদিকে চীনও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছে। একই সময়ে ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সংঘাত নিয়ে আলোচনা করেছেন।
হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার প্রস্তাব
সংঘাত নিরসনের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি। ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন তাদের দাবিগুলো মেনে নিলে দুই দিনের মধ্যে প্রণালিটি পুনরায় খুলে দিতে প্রস্তুত তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, দুই দিনের মধ্যে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সম্ভাবনা ইরানের সদিচ্ছারই প্রমাণ।
এর আগে গত সেপ্টেম্বরে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে সাত দিনের একটি পরিকল্পনা প্রস্তাব করেছিল ইরান। এতে সব রণাঙ্গনে যুদ্ধ বন্ধ, বিদেশে জব্দ করা ইরানি সম্পদ অবমুক্ত, তেল খাতের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছিল।
অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য ইরান ও ওমানের মধ্যে সম্মত নতুন পথ যুক্তরাষ্ট্রকে মেনে নিতে হবে। পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও অঞ্চলটিতে মার্কিন সেনাসংখ্যা কমানোর দাবিও জানিয়েছেন তিনি।
সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আপস নয় ইরানের
চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে সোমবার ইরান ও সৌদি আরবের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই। বৈঠকে ইরানের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষায় তেহরানের পাশে থাকার কথা জানিয়েছে বেইজিং। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের উপসচিব আলি বাকেরি জানিয়েছেন, জাতীয় নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার প্রশ্নে তেহরানের অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে। এ বিষয়ে কোনো আপস করা হবে না।
এদিকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বেইজিংয়ে ওমানের সুলতান হাইথাম বিন তারিকের সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। বৈঠক শেষে দুই দেশ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উপায়ে বিরোধ নিষ্পত্তি, যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা এবং সংঘাত এড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে।
ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি, ইরানের পাল্টা সতর্কতা
কূটনৈতিক আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হলেও ইরানের বিরুদ্ধে হুমকি অব্যাহত রেখেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রোববার তিনি বলেন, অনির্দিষ্ট কোনো এক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নিতে হতে পারে।
এর আগে শনিবার মধ্য ইরানের পিকঅ্যাক্স পর্বতসহ এক বা দুটি লক্ষ্যবস্তু নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি। স্থানটিকে সন্দেহভাজন পারমাণবিক স্থাপনা হিসেবে বিবেচনা করা হলেও সেখানে এমন কোনো স্থাপনা থাকার কথা অস্বীকার করে আসছে তেহরান।
অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের আগ্রাসনের শক্তিশালী, তাৎক্ষণিক ও সর্বাত্মক জবাব দেওয়া হবে। সব মিলিয়ে একদিকে কূটনৈতিক সমঝোতার চেষ্টা, অন্যদিকে সামরিক হুমকি ও পাল্টা সতর্কতায় যুক্তরাষ্ট্র-ইরান পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যেই রয়েছে।