দুই দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি থাপ্পড়ের ছবি ঘুরছে। ছবিটি ঘিরে আলোচনা, সমালোচনা ও নানা মত তৈরি হয়েছে। ঘটনাটি টঙ্গী এলাকার একটি কোরআন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে। অভিযোগ, সাত বছরের এক শিক্ষার্থীকে চুমু দেওয়ার ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির এক শিক্ষককে একজন ব্যক্তি থাপ্পড় দিয়েছেন। পরে বিষয়টি নিয়ে মাদ্রাসায় হামলা, দুই পক্ষের মামলা ও পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের কথাও সামনে এসেছে।
ঘটনার সত্যতা ও আইনগত দায় নির্ধারণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। তবে একটি শিশুকে ঘিরে এমন অভিযোগ উঠলে বিষয়টি হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ এখানে শুধু একজন শিক্ষক ও একজন অভিভাবকের বিরোধের প্রশ্ন নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি শিশুর নিরাপত্তা, তার মানসিক স্বস্তি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদ পরিবেশের প্রশ্ন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ বলছেন, শিক্ষক হয়তো আদর করে পড়াতে গিয়ে শিশুটিকে চুমু দিয়েছেন। কেউ কেউ এমন কথাও বলছেন, শিক্ষার্থী তো নিজের মেয়ের মতো। কিন্তু এখানে মূল প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। একজন শিক্ষার্থীকে নিজের সন্তানের মতো মনে করা আর তার ব্যক্তিগত সীমারেখা অতিক্রম করা এক বিষয় নয়। শিশুকে স্নেহ করা যায়, উৎসাহ দেওয়া যায়, মাথায় হাত রাখা যায়। কিন্তু শিশুর সম্মতি, স্বস্তি ও নিরাপত্তাকে উপেক্ষা করে শারীরিক স্পর্শকে স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া যায় না।
বিশেষ করে সাত বছরের একটি শিশুর ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল। শিশু অনেক সময় বুঝতেও পারে না কোন আচরণ স্বাভাবিক আর কোন আচরণ তার জন্য অস্বস্তিকর বা অনাকাঙ্ক্ষিত। তাই কোনো শিশু কোনো আচরণ নিয়ে অস্বস্তি প্রকাশ করলে কিংবা অভিভাবককে জানালে সেটিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা জরুরি।
এখানে আরেকটি বিষয় মনে রাখা দরকার। কোনো শিক্ষক বা ধর্মীয় শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাকে অপরাধী ঘোষণা করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি শিশুর অভিযোগকে তুচ্ছ করে দেখাও ভয়ংকর ভুল। তদন্ত হবে, সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য নেওয়া হবে এবং আইন অনুযায়ী সত্যতা ও দায় নির্ধারিত হবে। সেটিই সভ্য সমাজের পথ।
একজন অভিভাবক তার সন্তানকে কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শের শিকার হয়েছে বলে জানতে পারলে ক্ষুব্ধ হওয়া অস্বাভাবিক নয়। সন্তানকে নিরাপদ রাখার তাগিদ থেকেই তার প্রতিক্রিয়া আসতে পারে। কিন্তু সেই ক্ষোভও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অনুমতি দেয় না। থাপ্পড় দেওয়া, মিছিল করা কিংবা পাল্টা হুমকি দেওয়া কোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়।
একইভাবে কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তাকে রক্ষা করার নামে আন্দোলন, পাল্টা হুমকি কিংবা অভিযোগকারীকে সামাজিকভাবে হেয় করার চেষ্টাও গ্রহণযোগ্য নয়। এতে শিক্ষক সমাজের মর্যাদা রক্ষা হয় না, বরং সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিশুর নিরাপত্তা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধর্মীয় হোক কিংবা সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সেখানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সম্পর্কের ভিত্তি হবে বিশ্বাস, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা। কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত শারীরিক স্পর্শকে আদর বলে এড়িয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে।
আমরা প্রায়ই বড় কোনো ঘটনা ঘটার পর প্রশ্ন করি, আগে কেউ বিষয়টি বুঝতে পারেনি কেন? অথচ অনেক সময় বড় বিপদের আগে ছোট ছোট সতর্ক সংকেত দেখা যায়। তাই কোনো শিশুর অস্বস্তি, ভয় কিংবা অভিযোগকে গুরুত্ব দেওয়া মানে কাউকে আগেভাগে অপরাধী বানানো নয়, বরং শিশুর নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
আর যারা অভিযুক্ত ব্যক্তিকে রক্ষা করতে গিয়ে বলছেন, এতে এমন কী হয়েছে, তাদেরও একটু ভাবা দরকার। একজন শিশুর কাছে যে আচরণ অস্বস্তিকর, সেটিকে প্রাপ্তবয়স্কদের সুবিধামতো ব্যাখ্যা করে স্বাভাবিক বানিয়ে দেওয়া উচিত নয়।
অন্যদিকে, যদি অভিযুক্ত শিক্ষক সত্যিই কোনো অনুচিত আচরণ করে থাকেন এবং সে বিষয়ে তার নিজের বক্তব্য বা স্বীকারোক্তি থাকে, তাহলে বিষয়টি নিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি না করে আইনগত প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়াই দায়িত্বশীল আচরণ। আন্দোলন, পাল্টা হুমকি কিংবা সামাজিক শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে বিষয়টি আরও জটিল করার প্রয়োজন নেই।
একটি থাপ্পড়ের ছবি হয়তো দুই দিনের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে হারিয়ে যাবে। কিন্তু ওই শিশুটির মনে ঘটনাটির প্রভাব কতদিন থাকবে, সেটি আমরা জানি না। তাই ছবির থাপ্পড় নিয়ে পক্ষ নেওয়ার আগে আমাদের প্রশ্ন হওয়া উচিত, শিশুটি নিরাপদ তো?
শিক্ষককে সম্মান করতে হবে, ধর্মীয় শিক্ষকদেরও সম্মান করতে হবে। কিন্তু সম্মানের ঊর্ধ্বে একটি শিশুর নিরাপত্তা। একই সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তিরও ন্যায়বিচারের অধিকার রয়েছে। তাই আবেগ নয়, আইন এবং শিশুর সুরক্ষাকেই সামনে রেখে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত।
শিশুর নিরাপত্তার প্রশ্নে আমাদের অবস্থান স্পষ্ট হওয়া দরকার। অভিযোগ সত্য হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা হবে, অভিযোগ মিথ্যা হলে অভিযুক্ত ব্যক্তি আইনি প্রতিকার পাবেন। কিন্তু কোনো পক্ষই যেন নিজেদের প্রভাব, পরিচয় বা সংগঠনের শক্তি ব্যবহার করে সত্যকে আড়াল করার চেষ্টা না করে। কারণ একটি শিশুর নিরাপত্তার চেয়ে বড় কোনো পক্ষ নেই।