নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিঁথি আক্তার তারা দুইজনই বাংলাদেশি নাগরিক। সৌদি আরবের মক্কার একটি মসজিদে কথিত অনৈতিক কাজের অভিযোগে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে বলে সৌদি গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু অভিযোগটি কি ঠিক ছিল, তাদের বিরুদ্ধে কি এধরনের মামলা হয়েছিল, এর প্রমাণ কি আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছিল এবং বিচারপ্রক্রিয়াটি কিভাবে সম্পন্ন হয়েছে- এসব বিষয়ে বাংলাদেশি জনগণের কাছে এখনো পরিষ্কার ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই। আরও উদ্বেগের বিষয়, বাংলাদেশি কূটনৈতিক মিশনও জানিয়েছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তাদের কাছে এ বিষয়ে কোনো সরকারি নোটিশ বা কূটনৈতিক যোগাযোগ পৌঁছেনি। পরে বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর বাংলাদেশ কনস্যুলেট সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ, মামলা, বিচারপ্রক্রিয়া ও রায়ের বিস্তারিত জানতে চিঠি দিয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই কয়েকটি প্রশ্ন সামনে আসে। বিদেশের মাটিতে একজন বাংলাদেশি নাগরিক গ্রেফতার হলে তার পাশে দাঁড়ানোর দায়িত্ব কার? তিনি কি বাংলাদেশি কনস্যুলেটের সহায়তা পেয়েছিলেন? তিনি কি কনস্যুলার সহায়তা চেয়েছিলেন? চাইলে তাকে সেই সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না? তিনি আইনগত প্রতিনিধিত্বের সুযোগ পেয়েছিলেন কি না? মামলার রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ কিভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল? আর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষকে কেন কোনো তথ্য জানানো হলো না- এসব প্রশ্নের উত্তর জানা জরুরি।
আন্তর্জাতিক আইনের ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ভিয়েনা কনভেনশন অন কনস্যুলার রিলেশনসের ৩৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো বিদেশি নাগরিক গ্রেফতার বা আটক হলে তিনি অনুরোধ করলে সংশ্লিষ্ট দেশের কনস্যুলার কর্তৃপক্ষকে বিলম্ব না করে অবহিত করার বিধান রয়েছে। একই অনুচ্ছেদে কনস্যুলার কর্মকর্তাদের আটক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ, সাক্ষাৎ এবং তার আইনগত প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা করার অধিকারও স্বীকৃত হয়েছে।
অর্থাৎ, বিষয়টি শুধু একজন প্রবাসীর ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্য নয়- এটি নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব, কূটনৈতিক তৎপরতা এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগের সঙ্গেও সম্পর্কিত। একজন বাংলাদেশি নাগরিক বিদেশে গিয়ে আইনের আওতায় পড়লে তার অপরাধ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী বিচার হবে- এটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশ কোনো নাগরিককে বিদেশে আইন ভাঙার দায় থেকে মুক্ত করার দাবি করতে পারে না। কিন্তু বিচারপ্রক্রিয়া ন্যায়সংগত হয়েছে কি না, অভিযুক্ত ব্যক্তি তার মৌলিক ও কনস্যুলার অধিকার সম্পর্কে অবহিত হয়েছেন কি না এবং প্রয়োজনীয় কনস্যুলার সহায়তা পেয়েছেন কি না, সেটি জানার অধিকার বাংলাদেশেরও রয়েছে।
প্রশ্ন হলো, এই দুই বাংলাদেশির ক্ষেত্রে সেই দায়িত্ব কতটা পালন করা হয়েছে?
মৃত্যুদণ্ড কোনো সাধারণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়। একজন মানুষের জীবনের চূড়ান্ত পরিণতি এর সঙ্গে জড়িত। ফলে এমন একটি মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তি কখন গ্রেফতার হলেন, তার বিরুদ্ধে কি অভিযোগ আনা হলো, আদালতে কি শুনানি হয়েছে, কি রায় হয়েছে, আপিল হয়েছে কি না এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সিদ্ধান্ত কিভাবে চূড়ান্ত হলো- প্রতিটি ধাপ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট দেশের কূটনৈতিক মিশনের যথাসম্ভব অবহিত থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আরেকটি বিষয়ও স্পষ্ট হওয়া দরকার। কনস্যুলার সহায়তা মানে কোনো অপরাধীকে বাঁচিয়ে দেওয়া নয়। কনস্যুলার সহায়তার অর্থ হলো- নিজ দেশের নাগরিক যেন বিদেশের আইনি ব্যবস্থায় তার অধিকার সম্পর্কে জানতে পারেন, প্রয়োজনীয় যোগাযোগের সুযোগ পান এবং সম্ভব হলে উপযুক্ত আইনগত সহায়তা পাওয়ার পথ খুঁজে পান। রাষ্ট্রের দায়িত্ব নাগরিকের অপরাধকে সমর্থন করা নয়, নাগরিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার চেষ্টা করা।
সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। দেশটিতে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী বসবাস ও কাজ করেন। তারা শুধু প্রবাসী নন, দেশের অর্থনীতিতে তাদের অবদানও গুরুত্বপূর্ণ। বৈদেশিক মুদ্রা পাঠিয়ে তারা দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে বড় ভূমিকা রাখেন। তাই একজন প্রবাসী বিদেশে বিপদে পড়লে তার পাশে রাষ্ট্র কতটা কার্যকরভাবে দাঁড়াচ্ছে- এটি শুধু ওই ব্যক্তির পরিবারের প্রশ্ন নয়, লাখো প্রবাসীর নিরাপত্তা ও আস্থার প্রশ্ন।
বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনের কাজ শুধু পাসপোর্ট, ভিসা বা কাগজপত্রের প্রশাসনিক সেবা দেওয়া নয়। বিদেশে বাংলাদেশের নাগরিকদের স্বার্থ রক্ষা, প্রয়োজনীয় কনস্যুলার সহায়তা দেওয়া এবং সংকটের সময় তাদের পাশে দাঁড়ানোও কূটনৈতিক দায়িত্বের অংশ। কোনো বাংলাদেশি নাগরিক মৃত্যুদণ্ডের মতো চূড়ান্ত শাস্তির মুখোমুখি হলে বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
তাই এখন শুধু সৌদি সরকারের কাছে চিঠি পাঠিয়েই দায়িত্ব শেষ করা উচিত নয়। বাংলাদেশ সরকারের উচিত সংশ্লিষ্ট দুই নাগরিকের পরিচয়, গ্রেফতার, সময়, অভিযোগ, মামলার নথি, আদালতের রায়, আপিলের সুযোগ ও তার ফলাফল, কনস্যুলার যোগাযোগের তথ্য এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য চাওয়া। একই সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশন আগে থেকে কোনো তথ্য পেয়েছিল কি না, পেয়ে থাকলে কি পদক্ষেপ নিয়েছিল, আর না পেয়ে থাকলে কেন পায়নি- সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
কারণ একজন বাংলাদেশি বিদেশে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়ে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করেছেন- এমন ঘটনার পর রাষ্ট্রের নীরব দর্শক হয়ে থাকার সুযোগ নেই। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ সত্য হলে আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে, কিন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্বও তার নিজস্ব গতিতে চলতে হবে।
আমি একজন প্রবাসীর বাবা হিসেবে বলবো, প্রবাসীরা শুধু রেমিট্যান্স পাঠানোর মানুষ নন। তারা বাংলাদেশের নাগরিক। দেশের অর্থনীতিতে তাদের অবদান যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি বিদেশের মাটিতে তাদের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদার বিষয়টিও রাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত।
নজরুল ও সিঁথির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় তাই আবেগের পাশাপাশি প্রয়োজন স্বচ্ছ তদন্ত ও তথ্যভিত্তিক জবাব। অভিযোগ কি ছিল, বিচার কিভাবে হয়েছে এবং বাংলাদেশি কূটনৈতিক মিশন কি ভূমিকা রেখেছে- এসব প্রশ্নের পরিষ্কার উত্তর পাওয়া দরকার।
আজ নজরুল ও সিঁথি। আগামীকাল অন্য কোনো বাংলাদেশি নাগরিকও বিদেশের কোনো আইনি জটিলতায় পড়তে পারেন। তখন তার পরিবারের প্রথম প্রশ্ন হবে- বাংলাদেশ কি তার পাশে দাঁড়িয়েছিল?
এই প্রশ্নের উত্তর যেন আর কোনো বাংলাদেশি প্রবাসী পরিবারকে খুঁজতে না হয়- সেটিই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের দায়িত্ব।