কোনো নারী পরকীয়ায় জড়িত কি না, কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ সত্য কি না- এসব নির্ধারণ করার দায়িত্ব সাধারণ মানুষের নয়। অভিযোগ থাকলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে যেতে হবে, তদন্ত হবে, প্রয়োজন হলে আদালতে বিচার হবে। কিন্তু অভিযোগের নামে একজন নারীকে গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্যাতন করা, জোর করে চুল কেটে দেওয়া কিংবা অপমান-লাঞ্ছনার ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া কোনোভাবেই সভ্য সমাজের স্বাভাবিক ঘটনা হতে পারে না।
ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের বেপারীডাঙ্গী গ্রামের একটি ঘটনা সেই কঠিন প্রশ্ন আমাদের সামনে এনেছে। অভিযোগ উঠেছে, সৌদি প্রবাসী রাজিব বেপারীর স্ত্রী রিক্তা বেগমকে পরকীয়ার অভিযোগ তুলে নির্যাতন করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে তাঁকে জোর করে চেয়ারে বসিয়ে চুল কেটে দেওয়ার দৃশ্য এবং অন্য একটি ভিডিওতে গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখার দৃশ্য দেখা গেছে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে। এ ঘটনায় সুমন হোসেন ও জয় হোসেন নামে দুই যুবকের বিরুদ্ধে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে।
ঘটনাটি সত্যিই যদি এমন হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন একটাই, আইন কোথায় ছিল?
কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকতেই পারে। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের সুযোগও রয়েছে। কিন্তু সেই অভিযোগের বিচার করার অধিকার কে দিল কিছু মানুষকে? একজন নারীকে প্রকাশ্যে অপমান করার, তাঁর শরীরে হাত দেওয়ার, চুল কেটে দেওয়ার কিংবা সামাজিকভাবে হেয় করার অধিকার কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নেই।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এমন ঘটনার ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া। এতে একজন ভুক্তভোগী শুধু ঘটনার সময়ই অপমানিত হন না, ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার মাধ্যমে তাঁর সেই অপমান বারবার ফিরে আসে। একটি মুহূর্তের নির্যাতন তখন দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক হয়রানিতে পরিণত হতে পারে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, অভিযোগকারী বিচারক নন, অভিযুক্তও অপরাধী প্রমাণিত নন এবং জনতা আদালত নয়। রাষ্ট্রে আইন আছে, আদালত আছে, তদন্তকারী সংস্থা আছে। বিচার পাওয়ার পথ কঠিন হলেও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার কোনো বৈধতা নেই।
আর যদি কোনো নারীকে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা চরিত্র নিয়ে অভিযোগের ভিত্তিতে এভাবে নির্যাতন করা হয়, তাহলে বিষয়টি শুধু একজন নারীর ওপর সহিংসতার ঘটনা নয়, এটি আমাদের সামাজিক ও বিচারব্যবস্থার প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ। কারণ আজ একজন নারীকে অপমান করা হচ্ছে, কাল একই কায়দায় অন্য কাউকেও লক্ষ্যবস্তু বানানো হতে পারে।
পুলিশ জানিয়েছে, ভিডিওটি নজরে আসার পর অভিযুক্তদের গ্রেফতারে অভিযান শুরু হয়েছে এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে। এটি অবশ্যই ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে শুধু কয়েকজনকে গ্রেফতার করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটন, ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তির ভূমিকা খতিয়ে দেখা এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের প্রতিও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানাতে হবে। নির্যাতনের ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া কোনো প্রতিবাদ নয়, বরং তা ভুক্তভোগীর মর্যাদাহানি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। এমন ভিডিও শেয়ার করার আগে আমাদের ভাবতে হবে- ভিডিওটির মানুষটি কোনো অপরাধের প্রমাণ নয়, তিনি একজন মানুষ, তাঁরও মর্যাদা এবং ব্যক্তিগত জীবনের অধিকার আছে।
আমরা কি এমন সমাজ চাই, যেখানে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই কয়েকজন মানুষ মিলে নিজেরাই বিচার করে ফেলবে? যেখানে আদালতের রায়ের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাউকে অপরাধী বানিয়ে দেওয়া হবে? যেখানে একজন নারীর চুল কেটে দেওয়া হবে শাস্তি হিসেবে?
না, এমন সমাজ কোনোভাবেই কাম্য নয়। আইনের শাসনের অর্থই হলো- অভিযোগের বিচার আইন করবে, প্রতিশোধ নেবে না জনতা। অপরাধ করলে শাস্তি হবে, কিন্তু সেই শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা রাষ্ট্রের আইনসম্মত প্রতিষ্ঠানের, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নয়।
ফরিদপুরের এই ঘটনা তাই শুধু একটি গ্রামের একটি পরিবারের বিষয় নয়। এটি আমাদের সমাজের জন্য একটি সতর্কবার্তা। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বন্ধ করতে না পারলে একদিন আমরা সবাই এর শিকার হতে পারি।
এখন প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষা এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা। একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে, কোনো অভিযোগ-ই যেন কাউকে আইনবহির্ভূত শাস্তি দেওয়ার অজুহাত না হয়। কারণ একটি সভ্য রাষ্ট্রে অপরাধের বিচার হয় আদালতে, গাছের সঙ্গে বেঁধে নয়, মাথার চুল কেটে দেওয়া নয়।