সত্য কখনো কখনো গুজবের চেয়েও নির্মম। আর সেই সত্য জানার আগেই যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগ, অনুমান ও বানোয়াট গল্প ছড়িয়ে পড়ে, তখন একটি ঘটনা শুধু বিভ্রান্তিকরই হয়ে ওঠে না, মৃত মানুষের পরিবারকেও নতুন করে যন্ত্রণার মধ্যে ফেলে।
সৌদি আরবের মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা এখন ঠিক তেমনই এক আলোচিত বিষয়। গত ১৪ অক্টোবর সৌদি কর্তৃপক্ষ নজরুল ইসলাম আবদুল বশির ও সিথি আক্তার নামে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে। সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, মক্কার একটি মসজিদে অনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং মসজিদের পবিত্রতা লঙ্ঘনের অভিযোগে তাদের গ্রেফতার করা হয়েছিল। মামলা আদালতে গিয়েছে, বিচার হয়েছে, উচ্চতর পর্যায়ে রায় বহাল থাকার পর রাজকীয় আদেশে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। কিন্তু এখানেই শেষ নয়, বরং এখান থেকেই শুরু হয়েছে বাংলাদেশের মানুষের অসংখ্য প্রশ্ন।
প্রথম প্রশ্ন, আসল ঘটনা কি? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে গল্প ছড়িয়েছে, তা কতটুকু সত্য? কোথাও বলা হচ্ছে নজরুল স্ত্রীকে নিয়ে ওমরা করতে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। কোথাও তাদের সম্পর্ক নিয়ে নানা রোমাঞ্চকর গল্প তৈরি করা হয়েছে। আবার কোথাও এমন সব ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যার সঙ্গে এ ঘটনার কোনো সম্পর্কই নেই এমনটাও বলা হচ্ছে। অথচ সৌদি কর্তৃপক্ষ নিজেরাও অভিযোগের সুনির্দিষ্ট বিবরণ প্রকাশ করেনি। এমনকি কোন মসজিদে, ঠিক কখন এবং কি ধরনের ঘটনা ঘটেছিল, এসব তথ্যও প্রকাশিত সরকারি বিবৃতিতে নেই।
নজরুল ইসলামের পারিবারিক পরিচয় নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা কথা ছড়িয়েছে। তবে সর্বশেষ প্রকাশিত তথ মতে তাঁর বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের বিরামপুর গ্রামে। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, জীবিকার সন্ধানে ২০২২ সালে ঋণ করে তিনি সৌদি আরবে গিয়েছিলেন এবং মক্কায় পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। দীর্ঘ সময় পরিবারের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ না থাকায় স্বজনদের উদ্বেগও ছিল। এখন সেই পরিবারই হারিয়েছে তাদের উপার্জনক্ষম সন্তানকে।
আর সিথি আক্তারকে ঘিরেও তৈরি হয়েছে নানা নাম ও পরিচয়ের বিভ্রান্তি। সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত তথ্যে তাঁর নাম সিথি আক্তার হিসেবে এসেছে। বাংলাদেশি বিভিন্ন প্রতিবেদনে আবার তাঁকে সিথি আক্তার কিংবা সুইটি আক্তার নামেও উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে যাচাই ছাড়া কোনো একটি নামকে চূড়ান্ত ধরে নেওয়ার আগে সরকারি নথি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তথ্য দেখা জরুরি। সিথি আক্তারের বাড়ি টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুর উপজেলায় বলে মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ সরকার ও কনস্যুলার যোগাযোগ নিয়ে। বাংলাদেশি মিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তারা এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক নোটিশ পায়নি। মৃত্যুদণ্ডের সংবাদ প্রকাশের পর জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ, মামলা, বিচারপ্রক্রিয়া ও আদালতের রায়ের বিস্তারিত জানতে চিঠি দিয়েছে। ভিয়েনা কনভেনশনের কনস্যুলার সম্পর্কবিষয়ক ৩৬ অনুচ্ছেদে আটক বিদেশি নাগরিকের কনস্যুলার যোগাযোগ ও অবহিত করার অধিকার রয়েছে। তাই এই ঘটনায় কনস্যুলারকে তথ্য দেওয়া হয়েছিল কি না, হয়ে থাকলে কখন এবং কিভাবে, এসব প্রশ্নের পরিষ্কার উত্তর পাওয়া এখন অত্যন্ত জরুরি।
আরেকটি বিষয় আরও বেশি উদ্বেগের। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে ভিডিওকে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য বলে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, সেটিও সত্য নয় বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। ২০ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে মসজিদুল হারাম ও মসজিদে নববী কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতে জানানো হয়েছে, ভাইরাল ভিডিওটির সঙ্গে সদ্য মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির কোনো সম্পর্ক নেই।
তাহলে প্রশ্ন হলো, একটি মানুষের মৃত্যুকে ঘিরে আমরা এত সহজে মিথ্যা গল্প বানাই কিভাবে? একজন প্রবাসীর মৃত্যুর সঙ্গে কেন কাল্পনিক প্রেমকাহিনি জুড়ে দিই? কেন পুরোনো ভিডিওকে নতুন ঘটনার দৃশ্য বলে চালিয়ে দিই? কেন একটি পরিবারের শোকের ওপর নিজেদের ফেসবুক খ্যাতির মশলা ছড়িয়ে দিই?
নজরুল অপরাধী ছিলেন কি না, এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সৌদি আদালত দিয়েছে। কিন্তু সেই রায়ের বাইরে নতুন গল্প বানানোর অধিকার কারও নেই। একইভাবে সিথি আক্তারকে নিয়েও প্রমাণ ছাড়া কোনো ব্যক্তিগত বা নৈতিক চরিত্রের গল্প তৈরি করা সাংবাদিকতা ও সামাজিক দায়িত্বশীলতার পরিচয় নয়।
আমাদের মনে রাখতে হবে, অভিযোগ আর প্রমাণ এক জিনিস নয়। আদালতের রায় আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গল্পও এক জিনিস নয়। একটি রাষ্ট্রের আদালত কোনো রায় দিলে তার আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতে পারে, তথ্য চাওয়া যেতে পারে, কনস্যুলার অধিকার নিয়ে কথা বলা যেতে পারে। কিন্তু তার সঙ্গে কল্পকাহিনি জুড়ে দেওয়া যায় না।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ছয় দিন পরও বাংলাদেশে এ ঘটনা নিয়ে নিশ্চিত ও পূর্ণাঙ্গ তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। বাংলাদেশি মিশনই যখন সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে মামলার নথি, অভিযোগ ও রায়ের বিস্তারিত জানতে চাইছে, তখন আমাদের আরও দায়িত্বশীল হওয়া উচিত। আগে তথ্য, পরে মতামত এবং আগে যাচাই, পরে প্রচার। সাংবাদিকতা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম উভয় ক্ষেত্রে এ নীতিই হওয়া উচিত।
নজরুলের পরিবার এখন ছেলের মরদেহ দেশে ফেরত পাওয়ার অপেক্ষায়। দুটি পরিবার তাদের সন্তান হারিয়েছে, আরও পরিবার হারিয়েছে তাদের স্বজন। তাদের শোকের সময় আমাদের দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। সত্য জানা জরুরি, কিন্তু সত্যের নামে মিথ্যা গল্প তৈরি করা নয়।
আমি যে তথ্য তুলে ধরলাম, সেটিও অন্ধভাবে বিশ্বাস করার প্রয়োজন নেই। বরং সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি, সৌদি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং বাংলাদেশ মিশনের আনুষ্ঠানিক তথ্য সামনে আসুক। কোথাও ভুল থাকলে তা সংশোধন হোক। নতুন কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া গেলে সেটিও প্রকাশ্যে আসুক।
কারণ এ ঘটনার সবচেয়ে বড় শিক্ষা একটাই। গুজব যত দ্রুত ছড়ায়, সত্য তত দ্রুত ছড়ায় না। কিন্তু সত্য প্রকাশের দায়িত্ব থেকে আমাদের সরে যাওয়ার সুযোগও নেই। দুই প্রবাসীর মৃত্যুকে ঘিরে তাই আমাদের সবচেয়ে বড় দাবি হওয়া উচিত, গুজব নয়, পূর্ণ সত্য চাই।