গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, এই বছর সমগ্র বাংলাদেশে আমরা ভূমিহীন প্রান্তিক এবং ক্ষুদ্র ৪০ লক্ষ কৃষকদের কাছে কৃষি কার্ড পৌঁছে দিব, ইনশাআল্লাহ। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) বিকেলে রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা ময়দানে আঁখ চাষিদের প্রণোদনা প্রদান ও জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য তিনি এ ঘোষণা দেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই কৃষি কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের জন্য মোট ১০টি বিশেষ সুবিধা রাখা হবে। এর মাধ্যমে ফসলের উপকরণ সহায়তা প্রদান করা হবে, যার আওতায় কৃষকদের অন্তত ১টি ফসলের প্রয়োজনীয় সার, বীজ ও কীটনাশক সরকারের পক্ষ থেকে পৌঁছে দেওয়া হবে।
এছাড়াও এই কার্ড ব্যবহার করে কৃষকরা ব্যাংক ঋণ, ফসলের বীমা, আবহাওয়া সংক্রান্ত আগাম তথ্য এবং বীজ বপন ও সার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে বলেও জানান তিনি।
"নির্বাচনের আগে আমরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম যে, বিএনপি সরকার গঠন করলে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ সুদসহ মওকুফ করা হবে। সরকার গঠনের মাত্র সাত দিনের মাথায় আমরা সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে সমগ্র বাংলাদেশের ১৩ লক্ষ কৃষকের ১ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ সুদসহ মওকুফ করে দিয়েছি।
কৃষি ও কৃষককে বাঁচাতে আমরা 'ফার্মারস কার্ড' বা 'কৃষি কার্ড' বিতরণের কাজ শুরু করেছি। এরই মধ্যে ক্ষুদ্র, মাঝারি, প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষকদের তালিকা তৈরির কাজ এগিয়ে চলেছে। ইনশাআল্লাহ এই বছরেই সমগ্র বাংলাদেশে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ৪০ লক্ষ প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকের হাতে এই কৃষি কার্ড পৌঁছে দেওয়া হবে।
এই কার্ডের মাধ্যমে বছরে অন্তত একটি ফসলের প্রয়োজনীয় সার, বীজ ও কীটনাশক বিনামূল্যে বা ভর্তুকিতে সরকারের পক্ষ থেকে পৌঁছে দেওয়া হবে। এছাড়া কার্ডের মাধ্যমে সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ, ফসলের বীমা এবং মোবাইলে আগাম আবহাওয়া বার্তা পাওয়ার সুবিধা থাকবে। এই কৃষি কার্ডে মোট ১০টি বিশেষ সুবিধা অন্তর্ভুক্ত থাকবে।"
প্রধানমন্ত্রী বলেন, "শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় বরেন্দ্র প্রকল্প ও খাল খনন কর্মসূচি শুরু হয়েছিল। কৃষক ভাইদের সেচ সুবিধা নিশ্চিত করতে এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পুনর্ভরণ করতে আমরা পুনরায় খাল খনন ও নদী সংস্কার কর্মসূচি হাতে নিয়েছি। আগামী পাঁচ বছরে আমরা ২০,০০০ কিলোমিটার খাল খনন করব, যার মধ্যে গত আট মাসেই প্রায় ৮০০ কিলোমিটার খাল খননের কাজ শেষ করা হয়েছে।"
স্বাস্থ্যখাতের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, "স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে জনগণের নির্বাচিত বিএনপি সরকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে—আগামী ৫ বছরের মধ্যে দেশের প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৫০ বেড থেকে ১৫০ বেডের হাসপাতালে উন্নীত করা হবে।
কলকারখানা খোলা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, "শ্রমিক ভাইদের বেকারত্ব দূর করতে ও কর্মসংস্থান ফেরাতে বন্ধ মিল-কারখানাগুলো পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আহ্বান জানিয়ে এরই মধ্যে ৬টি বন্ধ কারখানা চালু করা হয়েছে এবং আগামী ১২ মাসে আরও শিল্প কারখানা চালুর প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।"
তারেক রহমান বলেন, "দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া মেয়েদের ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত শিক্ষা বিনামূল্যে করেছিলেন। বর্তমান বিএনপি সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে—মেয়েদের শিক্ষা অনার্স (ডিগ্রি) পর্যায় পর্যন্ত সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করা হবে এবং মেধাবী ছাত্রীদের উপবৃত্তি দেওয়া হবে। এর পাশাপাশি পরিবারকে মায়ের নেতৃত্বে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে প্রতিটি পরিবারকে 'ফ্যামিলি কার্ড' দেওয়া হবে। এই কার্ডের মাধ্যমে মা-বোনদের হাতে প্রতি মাসে সরাসরি আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে, যাতে তারা সন্তানদের পুষ্টি ও শিক্ষার চাহিদা মিটিয়ে ক্ষুদ্র পুঁজি গড়ে তুলতে পারেন।"
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, "২৪-এর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে গতকাল ঢাকার ওসমানী উদ্যানে আমরা একটি স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করেছি। আহত জুলাই যোদ্ধাদের সুচিকিৎসা ও কর্মসংস্থানের দায়িত্ব বিএনপি নিয়েছে।
কিন্তু দুঃখের বিষয়, যারা মুখে ২৪-এর কথা বলে, তারা শহীদদের শ্রদ্ধার সেই অনুষ্ঠানে কোনো প্রতিনিধি পাঠায়নি। বিএনপি ৭১ এবং ২৪-এর চেতনাকে সমানভাবে ধারণ করে।"
ষড়যন্ত প্রতিরোধের বিষয়ে তিনি বলেন,
"দেশের অগ্রগতি ও শিল্পাঞ্চলে অশান্তি সৃষ্টি করতে চক্রান্ত চলছে। গোয়েন্দাদের স্পষ্ট তথ্য আছে—পলায়নকৃত স্বৈরাচার সীমান্তের ওপার থেকে অর্থ সরবরাহ করছে এবং দেশের ভেতরের কিছু রাজনৈতিক চক্রের সাথে মিলে কলকারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ তৈরি করে স্থিতিশীলতা নষ্টের অপচেষ্টা করছে। দেশবাসীকে এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সজাগ থাকতে হবে।"
পদ্মা ও তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্পের বিষয়ে তিনি বলেন, "উত্তরবঙ্গের পানির সংকট ও পদ্মার পানি প্রবাহ সচল রাখতে আমরা দুইটি মেগা প্রজেক্ট হাতে নিয়েছি—রাজশাহীতে 'পদ্মা ব্যারেজ' এবং উত্তরাঞ্চলে 'তিস্তা ব্যারেজ'।
দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই দুই ব্যারেজের কাজ শুরু ও সম্পন্ন করা হবে, যা উত্তরাঞ্চলের অন্তত ১৪টি জেলার পানির সমস্যা দূর করবে এবং ভারতের কাছ থেকে আমাদের পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে সরকার কূটনৈতিক প্রয়াস জোরদার করবে।"
বিএনপি মহাসচিব (ভারপ্রাপ্ত) অ্যাড. রুহুল কবির রিজভীর সভাপতিত্বে সভায় বক্তব্য রাখেন, বিএনপির বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাড. শাহীন সৈকত, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল, রাজশাহী-১ (তানোর-গোদাগাড়ী) আসনের ধানের শীষের পরাজিত প্রার্থী ও চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা, মেজর জেনারেল (অব.) মো. শরীফ উদ্দীন, রাজশাহী-৩ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাড. শফিকুল হক মিলন, রাজশাহী-৪ (বাগমারা) ধানের শীষের পরাজিত প্রার্থী ডি এম ডি জিয়াউর রহমান, রাজশাহী-৫ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মন্ডল, রাজশাহী-৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবু সাইদ চাঁদ।
আরও বক্তব্য রাখেন, সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি নিপুণ রায় চৌধুরী, বাণিজ্য মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মোক্তাদির, ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু, সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়।
রাজশাহী মহানগর বিএনপি সাধারণ সম্পাদক ও রাসিকের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটনের সঞ্চালনায়
এসময় আরো উপস্থিত ছিলেন, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, প্রধানমন্ত্রীর আইসিটি উপদেষ্টা, রেহান আসিফ আসাদ, সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি মাহমুদা হাবিবা, ও সানজিদা তুলি, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বাবু জয়ন্ত কুমার কুন্ড, বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক (খুলনা বিভাগ), ওবায়দুর রহমান চন্দন।
আজ প্রধানমন্ত্রী রংপুর, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম সফর করবেন। রাজশাহী কর্মসূচি শেষে বিকেল ৪টা ১৫ মিনিটে শাহ মখদুম বিমানবন্দর থেকে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা করবেন।