জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে মানুষ লুটপাট, চাঁদাবাজি ও অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে পরিবর্তনের প্রত্যাশা নিয়ে রক্ত দিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, জনগণ কোনোভাবেই লুটতরাজ, চাঁদাবাজি ও অন্যায়-অবিচার মেনে নেবে না। প্রতিটি অপরাধের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জবাবদিহি করতে হবে।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) চট্টগ্রাম নগরীর জিইসি কনভেনশন সেন্টারে চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতের উদ্যোগে আয়োজিত ‘প্রাক্তন সাথী-সদস্য সম্মেলন-২০২৬’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, মানুষের ওপর জুলুম করা, অধিকার হরণ করা কিংবা অন্যের প্রাপ্য অধিকার কেড়ে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। যারা এসব অন্যায়ের সঙ্গে জড়িত, তাদের একদিন জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে। তাই ব্যক্তি ও সাংগঠনিক জীবনে সততা, নৈতিকতা এবং ন্যায়বিচারের চর্চা নিশ্চিত করতে হবে।
প্রাক্তন সাথী-সদস্যদের উদ্দেশে জামায়াত আমির বলেন, হালাল পথে জীবিকা নির্বাহ করতে হবে এবং সততা ও নৈতিকতার সঙ্গে জীবন পরিচালনা করতে হবে। দেশের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে কিছু ভিত্তিহীন ও অবান্তর বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব কথার জবাব দেওয়ার পেছনে সময় ব্যয় না করে আদর্শ, নৈতিকতা ও কাজের মাধ্যমে মানুষের আস্থা অর্জন করতে হবে। দেশে ইসলামের আদর্শ প্রতিষ্ঠা এবং ন্যায়বিচারভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন তিনি।
সম্মেলনে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, জুলাইয়ের আন্দোলনে চট্টগ্রাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। প্রাক্তন সাথী-সদস্যদের এই আয়োজন তাকে অভিভূত করেছে। ইসলামী আন্দোলন ব্যক্তিগত স্বার্থ বা দুনিয়াবি প্রাপ্তির জন্য নয়; বরং আদর্শিক বিশ্বাস ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যেই পরিচালিত হয়। দেশের কল্যাণে ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তিতে সুন্দর সমাজ প্রতিষ্ঠায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আজাদ বলেন, প্রাক্তন সাথী-সদস্যদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি তাদের আদর্শিক চেতনার বহিঃপ্রকাশ। এই সম্মেলন শুধু মিলনমেলা নয়, বরং দেশের প্রয়োজন ও সংকটময় সময়ে ঐক্যবদ্ধভাবে দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার। অতীতের অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে দেশ গঠনে এগিয়ে আসতে হবে।
সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ শাহজাহান বলেন, দেশের মানুষ আদর্শিক পরিবর্তনের অপেক্ষায় রয়েছে। ন্যায়বিচার, সততা ও জনকল্যাণের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনার পরিবেশ তৈরিতে সবাইকে ভূমিকা রাখতে হবে। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মানুষের প্রত্যাশার কিছুটা প্রতিফলন দেখা গেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ জামায়াতের আমির ও সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুল বলেন, ছাত্রজীবনে সংগঠন থেকে অর্জিত নীতি-নৈতিকতা, আদর্শ ও প্রশিক্ষণ সারা জীবন কাজে লাগাতে হবে। ছাত্রশিবির নেতৃত্ব তৈরির গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। ছাত্রজীবনে অর্জিত নেতৃত্বের গুণাবলি সমাজ ও মূল সংগঠনের কার্যক্রমে প্রতিফলিত করার পাশাপাশি সততা ও দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে।
ঢাকা মহানগরী উত্তর জামায়াতের আমির মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিন বলেন, ছোটখাটো বিষয় নিয়ে দলাদলি না করে বৃহত্তর লক্ষ্য অর্জনে ঐক্য, সহনশীলতা ও দায়িত্বশীলতা বজায় রাখতে হবে। জামায়াতের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত না হলে দেশে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও রাহাজানি বন্ধ হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী বলেন, চট্টগ্রামে ইসলামী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা এবং মানুষের কল্যাণে প্রাক্তন সাথী-সদস্যদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। তাদের অভিজ্ঞতা, যোগ্যতা ও সাংগঠনিক দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে সমাজের উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদ বলেন, বাংলাদেশকে ন্যায়বিচার ও জনকল্যাণভিত্তিক রাষ্ট্রে পরিণত করার লক্ষ্য নিয়ে তরুণ সমাজকে কাজ করতে হবে। অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রামে ছাত্রশিবির প্রস্তুত রয়েছে বলেও জানান তিনি।
সভাপতির বক্তব্যে চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতের আমির মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, একটি ভবন নির্মাণে যেমন বিভিন্ন উপকরণের প্রয়োজন হয়, তেমনি একটি আদর্শিক সংগঠনকে শক্তিশালী করতেও সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। সংগঠনের সদস্যদের ঐক্যবদ্ধ জীবনযাপন এবং দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সম্মেলনে কেন্দ্রীয় ও মহানগর পর্যায়ের জামায়াত নেতারা ছাড়াও চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও রাঙামাটিসহ বিভিন্ন জেলার নেতারা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানের বিভিন্ন পর্ব সঞ্চালনা করেন কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সদস্য ও চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি অধ্যক্ষ মুহাম্মদ নুরুল আমিনসহ সংগঠনের অন্য নেতারা।