দেশের কওমি মাদ্রাসাগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকতা করেও আর্থিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন অনেক শিক্ষক। প্রতিষ্ঠানভেদে তাঁদের মাসিক বেতন ৭ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা। পরিচিত কয়েকটি মাদ্রাসার জ্যেষ্ঠ শিক্ষকরা সর্বোচ্চ ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বেতন পেলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে বেতন অনিয়মিত। কোথাও কয়েক মাসের বেতন বকেয়া থাকার অভিযোগও রয়েছে।
শিক্ষকদের অভিযোগ, কওমি মাদ্রাসাগুলোতে বেতন নির্ধারণের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় প্রতিষ্ঠানপ্রধানেরা নিজেদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বেতন নির্ধারণ করেন। ফলে একই ধরনের দায়িত্ব পালন করেও শিক্ষকদের মধ্যে বেতনের পার্থক্য দেখা যায়। নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে স্বল্প বেতনে সংসার চালাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন তাঁরা।
রাজধানীর কাজলার জামেয়া রাহমানিয়া দারুল উলুম মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা আব্দুল হালিমের ভাই আব্দুল করিমের ভাষ্য অনুযায়ী, সাত মাসের বেতন না পেয়ে চাকরি ছেড়ে মধ্যপ্রাচ্যে পাড়ি জমান তাঁর ভাই। একইভাবে রাজধানীর কুড়িল এলাকার একটি মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা রাকিবুল ইসলাম পাঁচ মাস ধরে বেতন না পাওয়ার কথা জানিয়েছেন।

শিক্ষকদের অনেকে সংসারের ব্যয় মেটাতে মসজিদে ইমামতি, খতিবের দায়িত্ব পালন কিংবা ব্যক্তিগতভাবে কোরআন শিক্ষা দেওয়ার মতো কাজে যুক্ত হচ্ছেন। তবে এসব সুযোগ সবার জন্য সমান নয়। ফলে অনেককে একমাত্র শিক্ষকতার স্বল্প আয় দিয়ে পরিবার চালাতে হচ্ছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে দুই থেকে তিন মাস পর বেতন দেওয়ার অভিযোগও করেছেন শিক্ষকরা।
তাঁদের আরও অভিযোগ, কিছু মাদ্রাসার মুহতামিমদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হলেও সাধারণ শিক্ষকদের বেতন বাড়ছে না। মাদ্রাসার আয়-ব্যয়ের হিসাব ও অনুদানের অর্থ কীভাবে ব্যয় করা হয়, সে বিষয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবিও জানিয়েছেন তাঁরা। তবে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, পর্যাপ্ত তহবিল না থাকায় শিক্ষকদের প্রত্যাশা অনুযায়ী বেতন দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম মনে করেন, কওমি মাদ্রাসার স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেই শিক্ষকদের আর্থিক সহযোগিতার ব্যবস্থা করা সম্ভব। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়-ব্যয়ের হিসাব স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন। তাঁর মতে, শিক্ষকদের জন্য উপযুক্ত আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করা হলে তাঁদের জীবনমানের উন্নতির পাশাপাশি শিক্ষার মানও বাড়বে।
এদিকে কওমি মাদ্রাসাগুলোকে সরকারি ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা এবং আর্থিক তদারকির বিষয়ে অতীতে উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে আর্থিক ও অবকাঠামোগত বিষয়ে নজরদারির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল বলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
তবে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের (বেফাক) পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মাওলানা আব্দুল জলিল বলেছেন, সরকারের সঙ্গে যুক্ত না হওয়ার কারণ আর্থিক নিরীক্ষার ভয় নয়; বরং কওমি শিক্ষাব্যবস্থার নিজস্বতা ও স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার বিষয়টি তাঁদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। সংশ্লিষ্টদের মতে, কওমি মাদ্রাসার শিক্ষকদের জন্য সুনির্দিষ্ট বেতনকাঠামো, নিয়মিত বেতন পরিশোধ এবং আর্থিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে দীর্ঘদিনের এ সংকট অনেকটাই কমানো সম্ভব।