রাজনীতি হওয়ার কথা মানুষের জন্য। রাষ্ট্র, সমাজ ও মানুষের অধিকার রক্ষা, উন্নয়ন, ন্যায়বিচার এবং নিরাপদ ভবিষ্যৎ নির্মাণই রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজনীতির সেই আদর্শ অনেক জায়গাতেই যেন ক্রমেই ম্লান হয়ে যাচ্ছে। ক্ষমতা দখল, ক্ষমতা ধরে রাখা এবং প্রতিপক্ষকে পরাজিত করাই যেন রাজনীতির প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই বাস্তবতা শুধু বাংলাদেশে নয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেই রাজনৈতিক বিভাজন, সহিংসতা, উগ্র জনতার চাপ এবং প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে দেখার প্রবণতা বাড়ছে। আর প্রযুক্তির বিস্তার মানুষের মত প্রকাশের সুযোগ বাড়িয়েছে ঠিকই, কিন্তু একই সঙ্গে গুজব, উসকানি ও দলগত উত্তেজনাকেও দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। ফলে রাজনীতির মাঠ কখনো কখনো যুক্তির জায়গা হারিয়ে আবেগ, ঘৃণা ও সংঘাতের জায়গায় পরিণত হচ্ছে।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, রাজনীতির সংঘাতে সাধারণত বড় নেতারা সামনে থাকেন না। যেমন আওয়ামী লীগের অনেকেই দেশের বাইরে। বিপদে পড়ে কর্মী, সমর্থক ও সাধারণ মানুষ। সংঘর্ষ হলে আহত হয় মানুষ, প্রাণ যায় মানুষের। অথচ সিদ্ধান্ত নেওয়ার টেবিলে থাকা অনেকেই নিরাপদ দূরত্বে থাকেন। একজন কর্মীর মৃত্যু কোনো নেতার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ থামিয়ে দেয় না, কিন্তু একটি পরিবারে চিরদিনের জন্য শূন্যতা তৈরি করে। তাই রাজনীতির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। রাজনীতি কি মানুষের জীবন রক্ষার জন্য, নাকি মানুষের জীবনকে রাজনৈতিক স্বার্থের হাতিয়ার বানানোর জন্য?
আরও ভয়ংকর হচ্ছে, আমরা নিজেরাও কখনো কখনো এই সংস্কৃতির অংশ হয়ে যাচ্ছি। প্রতিপক্ষের ওপর হামলা হলে কেউ কেউ আনন্দ পাই, অন্য পক্ষের বিপদে উল্লাস করি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্রূপ করি। যেন নিজের পক্ষের মানুষ আঘাত করলে তা অন্যায়, আর প্রতিপক্ষের মানুষ আঘাত পেলে তা ন্যায়সংগত। এই মানসিকতা রাজনীতিকে শুধু বিভক্ত করে না, সমাজের বিবেককেও ধীরে ধীরে ধীরে ধীরে নষ্ট করে দেয়।
মব বা উচ্ছৃঙ্খল জনতার বিচার এরই একটি ভয়ংকর প্রকাশ। আইন, আদালত ও প্রাতিষ্ঠানিক বিচারব্যবস্থার বাইরে জনতার হাতে বিচার তুলে দেওয়া কোনো সভ্য সমাজের লক্ষণ হতে পারে না। কে অপরাধী, কে নির্দোষ, তার সিদ্ধান্ত দেওয়ার দায়িত্ব আদালতের। রাজনৈতিক মত, ধর্মীয় পরিচয়, সামাজিক অবস্থান কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধ কাউকেই আইনের ঊর্ধ্বে বা আইনের বাইরে যাওয়ার অধিকার দেয় না।
রাজনীতিতে মতের পার্থক্য থাকবে। বিরোধিতা থাকবে। তীব্র বিতর্কও থাকবে। কিন্তু মতের বিরোধিতা যেন মানুষকে শত্রুতে পরিণত না করে সেদিকে আমাদের থাকাতে হবে। কারণ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ মানেই দেশের শত্রু নয়। আজ যে মানুষটি আপনার আমার প্রতিপক্ষ, আগামীকাল কোনো জাতীয় সংকটে সেই মানুষটির সঙ্গেই হয়তো একই টেবিলে বসতে হবে।
রাজনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি তাই প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করা নয়, বরং ভিন্নমতকে সহ্য করার ক্ষমতা। একজন নেতা তখনই বড় হন, যখন তিনি নিজের কর্মীদের শুধু জয়ী হওয়ার শিক্ষা দেন না, পরাজয় মেনে নেওয়া, আইন মানা এবং প্রতিপক্ষের অধিকারকে সম্মান করার শিক্ষাও দেন।
আমাদের মনে রাখতে হবে, নেতা মারা গেলে নতুন নেতা তৈরি হতে পারে, কর্মী হারালে একটি পরিবার তার আপনজনকে আর ফিরে পায় না। রাজনৈতিক স্লোগান থেমে যায়, মিছিল শেষ হয়, ক্ষমতার পালাবদল হয়, কিন্তু একটি পরিবারের কান্না অনেক দীর্ঘস্থায়ী হয়।
তাই রাজনীতিতে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হওয়া উচিত কে জিতল আর কে হারল, সেটি নয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত, এই লড়াইয়ে দেশ কতটা জিতল, মানুষ কতটা নিরাপদ থাকল এবং আমাদের বিবেক কতটা বেঁচে রইল। রাজনীতি যদি মানুষের জন্য হয়, তাহলে মানুষের জীবনই হবে তার প্রথম অগ্রাধিকার। ক্ষমতা আসবে, ক্ষমতা যাবে। দল বদলাবে, নেতৃত্ব বদলাবে, সময় বদলাবে। কিন্তু মানুষের জীবন, মর্যাদা ও অধিকারকে রাজনৈতিক স্বার্থের কাছে বারবার বিসর্জন দেওয়া হলে শেষ পর্যন্ত রাজনীতি শুধু তার আদর্শই হারাবে না, হারাবে মানুষের আস্থাও।
সবচেয়ে বড় বিপদ তখনই, যখন মানুষ অন্যের মৃত্যু দেখে হাততালি দিতে শেখে এবং সেটাকেই রাজনীতি মনে করে। কারণ তখন শুধু একজন মানুষ মরে না, একটি পরিবার ভেঙে যায়। শুধু একটি কর্মী হারায় না, একটি রাজনৈতিক আদর্শ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর সবচেয়ে ভয়ংকর সত্য হলো, মানুষের ভেতরের বিবেকটিও একটু একটু করে মারা যেতে থাকে। রাজনীতির নামে মৃত্যুর সংস্কৃতি নয়, আমাদের প্রয়োজন মানুষের জন্য রাজনীতি।