সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে দালালচক্রের খপ্পরে পড়ে বেসরকারি ক্লিনিকে ছুটতে হচ্ছে রোগীদের, স্বাস্থ্যসেবার আড়ালে এমন হয়রানি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে এবার কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মোঃ সাখাওয়াত হোসেন। তাঁর অভিযোগ, সরকারি হাসপাতালের রোগীদের বেসরকারি ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়ার দালালচক্র বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়ে সৃষ্টি হয়েছে। এ চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান ও অনিয়মে জড়িত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি দেশের সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১৫১ শয্যায় উন্নীত করার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ১১ টার দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার ডাকবাংলোয় সরকারি সফরকালে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, আগামী ১০ দিনের মধ্যে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের দরপত্র আহ্বানের পরিকল্পনা রয়েছে।
হাসপাতাল ঘিরে দালালচক্র, নজরদারিতে ক্লিনিক।
সরকারি হাসপাতালের রোগীদের অন্যত্র নিয়ে যাওয়ার অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে মন্ত্রী বলেন, পুলিশ, গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালাচ্ছে। জেলা প্রশাসন ও সিভিল সার্জন কার্যালয়ও এ বিষয়ে কাজ করছে। নিয়মবহির্ভূতভাবে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, কোথাও কোথাও তালা লাগানো ও সিলগালা করা হচ্ছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক কিলোমিটারের মধ্যে নতুন কোনো বেসরকারি ক্লিনিকের অনুমতি দেওয়া হবে না বলে জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, সরকার নতুন করে কোনো ক্লিনিকের অনুমোদন দেয়নি। সম্প্রতি হাসপাতালের সামনে কোনো ক্লিনিক চালু হয়ে থাকলে সেটির অনুমোদন আগে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। তবে শর্ত পূরণ না করা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চিকিৎসকদের সঙ্গে ফার্মেসি ও অটোরিকশাচালকদের যোগসাজশে রোগীদের ওষুধ নির্ধারণ কিংবা অন্যত্র পাঠানোর অভিযোগও খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
১৫১ শয্যার হাসপাতালে থাকবে ডায়ালাইসিসসহ বিশেষায়িত সেবা।
শুধু শয্যা বাড়ানো নয়, উপজেলা পর্যায়েই উন্নত চিকিৎসার সুযোগ তৈরির পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন মন্ত্রী। প্রস্তাবিত ১৫১ শয্যার প্রতিটি হাসপাতালে ১০টি মেশিনসহ ডায়ালাইসিস সেন্টার থাকবে। সেখানে স্থানীয়ভাবে ২০ জন রোগী সেবা নিতে পারবেন। পাশাপাশি মাতৃত্বকালীন সেবায় ২০টি এবং নবজাতকদের জন্য ২০টি শয্যা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া নারী ও পুরুষের জন্য পৃথক দুটি ফিজিওথেরাপি সেন্টার এবং উন্নত প্যাথলজি সেবা চালুর ব্যবস্থাও থাকবে।
ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডেও পৌঁছাবে স্বাস্থ্যসেবা
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, ইউনিয়ন পর্যায়ে ডরমিটরিসহ সাড়ে তিনতলা ভবন নির্মাণ করা হবে। এসব ভবনে চিকিৎসকদের আবাসনের ব্যবস্থা থাকবে। উপজেলা হাসপাতাল উন্নয়নের পাশাপাশি এ প্রকল্পের দরপত্রও একই সময়ে আহ্বানের পরিকল্পনা রয়েছে।
ওয়ার্ড পর্যায়ে পুরোনো প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে মেডিকেল ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ার সেন্টার স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব কেন্দ্রে মিডওয়াইফরা দায়িত্ব পালন করবেন। নারীদের স্তন ও জরায়ুমুখের ক্যানসার শনাক্তে স্ক্রিনিং, রক্ত পরীক্ষা, জ্বর এবং উচ্চ ও নিম্ন রক্তচাপ পরীক্ষা করা হবে। রোগীদের তথ্য সংরক্ষণে দেওয়া হবে কার্ড। রোগের ধরন ও জটিলতা অনুযায়ী ইউনিয়ন থেকে উপজেলা, জেলা এবং প্রয়োজনে টারশিয়ারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ থাকবে।
ডায়ালাইসিস মেশিন ও চিকিৎসক নিয়োগের উদ্যোগ
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এক হাজার ১০০টির বেশি ডায়ালাইসিস মেশিনের দরপত্র প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। প্রতিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫০টি এবং জেলা হাসপাতালে ১০টি করে মেশিন দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে মেডিকেল কলেজ থাকা জেলায় মোট ৬০টি এবং মেডিকেল কলেজ না থাকা জেলায় জেলা হাসপাতালের জন্য ১০টি মেশিন থাকবে।
জনবলসংকট মোকাবিলায় আগামী ১ তারিখে সাড়ে ৪০০ চিকিৎসক যোগ দেবেন বলে জানান তিনি। আরও পাঁচ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে, এ জন্য সরকারি কর্ম কমিশনে (পিএসসি) সাক্ষাৎকার নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ২৫ হাজার মিডওয়াইফ নিয়োগ এবং প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের অংশ হিসেবে চলতি বছর ৪১ হাজার ৩৯১ জনকে নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানান মন্ত্রী। এসব স্বাস্থ্যকর্মী গ্রামাঞ্চলে, বিশেষ করে নারীদের স্বাস্থ্যসেবা দেবেন।
দুই বছরে স্বাস্থ্যব্যবস্থার চেহারা বদলানোর আশাবাদ
স্বাস্থ্যমন্ত্রী দাবি করেন, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় উপজেলায় ১৯ শয্যার হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সময় তা ৫০ শয্যায় উন্নীত হয়। এরপর উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে এবার উপজেলা হাসপাতালগুলোকে ১৫১ শয্যায় উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান।
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সাত মাস পার হয়েছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, এর মধ্যে চার মাস এমনিতেই চলে গেছে। তাই তাৎক্ষণিকভাবে সব সেবা উন্নত করা সম্ভব নয়। তাঁর অভিযোগ, বিগত সরকারের সময়ে লুটপাটের কারণে স্বাস্থ্য খাতের অবস্থা নিম্নমুখী হয়েছিল।
তবে আগামী দুই বছরের মধ্যে দুর্নীতিমুক্তভাবে চিকিৎসাব্যবস্থাকে উন্নত পর্যায়ে নেওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে চিকিৎসার জন্য মানুষের বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতা কমবে বলেও প্রত্যাশা করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
এ সময় স্থানীয় সংসদ সদস্য মুশফিকুর রহমান, জেলা প্রশাসক আবু সাইদ, পুলিশ সুপার মোঃ জালাল উদ্দিন ফাহিমসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।