বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়কে (বাউবি) আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ার কার্যকর প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের আহ্বান জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেছেন, বাউবির লক্ষ্য শুধু শিক্ষার্থীদের সনদ দেওয়া নয়, বরং শিক্ষার সুযোগবঞ্চিত মানুষের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ এবং জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) গাজীপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাসে বাউবির ৩৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, গত ৩৪ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জন, শিক্ষার মান, শিক্ষার্থীদের দক্ষতা এবং কর্মক্ষেত্রে তাঁদের অবদান তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। প্রচলিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতার পরিবর্তে উন্মুক্ত ও দূরশিক্ষার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য কাজে লাগিয়ে আধুনিক, কর্মমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
তিনি আরও বলেন, পাঠ্যক্রম ও মূল্যায়ন পদ্ধতির মানোন্নয়ন, পরীক্ষায় অনিয়ম ও নকল প্রতিরোধ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে কারিগরি ও কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষার প্রসারেও গুরুত্ব দিতে হবে।
অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী বাউবির ‘ইনস্টিটিউট অব টেকনিক্যাল অ্যান্ড ভোকেশনাল এডুকেশন অ্যান্ড ট্রেনিং’ (আইটিভিইটি) উদ্বোধন করেন। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রোগ্রামে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফল অর্জনকারী নয়জন শিক্ষার্থীকে প্রথমবারের মতো ডিনস অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হয়। স্নাতকোত্তর পর্যায়ের একজন তৃতীয় লিঙ্গের শিক্ষার্থীকে তাঁর কৃতিত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করা হয়।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাউবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান। তিনি বলেন, ৩৪ বছরের পথচলায় বিশ্ববিদ্যালয়টি একটি একাডেমিক প্রোগ্রাম থেকে বর্তমানে ৫৫টি প্রোগ্রাম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এখন শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি ও সনদ প্রদানের পাশাপাশি জ্ঞাননির্ভর, প্রযুক্তিসমৃদ্ধ, দক্ষতাভিত্তিক ও উদ্ভাবনমুখী শিক্ষা সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
উপাচার্য জানান, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, গ্রাফিক ডিজাইন, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং কোরিয়ান ও জাপানি ভাষা শিক্ষাসহ বিভিন্ন কর্মমুখী শিক্ষা কার্যক্রম চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, ডিজিটাল লার্নিং ব্যবস্থা এবং গবেষণার মান উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানে মুখ্য আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী। তিনি বলেন, বাউবি কর্মজীবী মানুষ, নারী, গ্রামীণ জনগোষ্ঠী এবং প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে থাকা মানুষের জন্য শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। শিক্ষার মানোন্নয়ন, গবেষণা ও উদ্ভাবন বৃদ্ধি এবং দেশি-বিদেশি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতা জোরদারের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ এবং বাউবির প্রো-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আনিসুর রহমান। অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মো. সিরাজুল ইসলাম স্বাগত বক্তব্য দেন। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন ট্রেজারার অধ্যাপক ড. শেখ রফিকুল ইসলাম।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।
সকালে জাতীয় পতাকা, বিশ্ববিদ্যালয়ের পতাকা ও সাতটি স্কুলের পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি শুরু হয়। পরে পায়রা অবমুক্তকরণ, বেলুন উড্ডয়ন, বর্ণাঢ্য র্যালি, চিত্র প্রদর্শনী ও প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনের আয়োজন করা হয়। দিনব্যাপী কর্মসূচির শেষ হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা সম্প্রসারণ, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন এবং জীবনব্যাপী শিক্ষার মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করেছে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।