স্বপ্নের পর্যটন নগরী থেকে সংকটের উপকূলে: উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি, বাস্তবতার ভাঙনে কুয়াকাটার দীর্ঘ অবহেলা!

Date: 2026-05-09
news-banner

আব্দুল কাইয়ুম আরজু, পটুয়াখালী প্রতিনিধি:

প্রকৃতির অকৃপণ দানে ধন্য এক জনপদ—কুয়াকাটা। একই সৈকতে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার বিরল সুযোগ থাকায় একে বলা হয় ‘সাগরকন্যা’। দক্ষিণ জনপদের এই পর্যটন কেন্দ্রটি ঘিরে দেশের অর্থনীতির বড় স্বপ্ন থাকলেও গত দুই দশকের বাস্তবতা ভিন্ন। নীতিনির্ধারকদের উদাসীনতা, আইনি জটিলতা এবং অপরিকল্পিত উন্নয়নের ধকলে এখন ম্লান হতে বসেছে কুয়াকাটার প্রাকৃতিক নান্দনিকতা।

গত দুই দশকে দেশে যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। পদ্মা সেতু ও পায়রা সেতুর সুবাদে ঢাকা থেকে কুয়াকাটা পৌঁছানো এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। কিন্তু পর্যটকদের যাতায়াত সহজ হলেও কুয়াকাটা সৈকতের ভেতরে দৃশ্যমান কোনো পরিকল্পিত উন্নয়ন হয়নি। বছরের পর বছর ধরে সরকার বিভিন্ন মহাপরিকল্পনার কথা বললেও বাস্তবে তার ছিটেফোঁটাও আলোর মুখ দেখেনি। পরিবেশবান্ধব পর্যটন নগরী গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি কেবল ফাইলেই বন্দি রয়ে গেছে।

সৈকতের ভাঙন রোধ এবং আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত না হওয়ায় পর্যটকদের মধ্যে এক ধরনের অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে স্থানীয় অর্থনীতিতে। পর্যটক কমে যাওয়ায় কুয়াকাটার ওপর নির্ভরশীল হাজারো ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী এবং শ্রমজীবী মানুষ চরম দুর্ভোগের মুখে পড়েছেন। বিনিয়োগকারীরা শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করে এখন অনিশ্চয়তায় দিন গুনছেন।

কুয়াকাটার কেন্দ্রবিন্দু বা জিরো পয়েন্ট সংলগ্ন এলাকাটি এখন উন্নয়নের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী মহলের স্বার্থ এবং আইনি জটিলতার কারণে সমুদ্র সৈকতের প্রধান কেন্দ্রটি শ্রীহীন হয়ে পড়ছে। নীতিনির্ধারণী মহলের দৃষ্টির আড়ালে থেকে যাওয়ায় এটি এখন সাধারণ মানুষের মনে বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে—কেন একটি জাতীয় সম্পদকে এভাবে ধুঁকতে দেওয়া হচ্ছে?

পরিবেশবিদদের মতে, কুয়াকাটার ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার মূল কারণ টেকসই পরিকল্পনার অভাব। যেখানে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ছিল, সেখানে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এভাবে চলতে থাকলে কুয়াকাটা কেবল পর্যটকদের কাছে আকর্ষণই হারাবে না, বরং উপকূলীয় বাসিন্দাদের জীবন-জীবিকা এবং প্রাকৃতিক সুরক্ষা বলয়ও চিরতরে ভেঙে পড়বে।

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, কুয়াকাটা কেবল একটি পর্যটন কেন্দ্র নয়, এটি পায়রা বন্দর সংলগ্ন একটি বড় অর্থনৈতিক হাব। এখনই যদি শক্ত হাতে কার্যকর উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা না হয়, তবে এই জনপদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য চরম দুর্যোগ অপেক্ষা করছে।
 
স্থানীয়দের দাবি জরুরি ভিত্তিতে পর্যটনবান্ধব একটি পূর্ণাঙ্গ মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করা। সৈকতে জিওব্যাগ বা অস্থায়ী সমাধানের বদলে স্থায়ী ও পরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ। উপকূল কেন্দ্রীক সংশ্লিষ্ট আইনি বাধাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করে পর্যটন কেন্দ্রকে আধুনিকায়ন করা। এবং বনায়ন বৃদ্ধি এবং সৈকতে অপরিকল্পিত স্থাপনা উচ্ছেদ করে প্রকৃতির আসল রূপ ফিরিয়ে আনা।

সংশ্লিষ্টদের মনে রাখা উচিত, কুয়াকাটার সম্ভাবনা কেবল একটি অঞ্চলের নয়, এটি গোটা দেশের। দায়িত্বশীল মহলের এখনই এগিয়ে আসার সময়, নয়তো দক্ষিণবঙ্গের এই আর্শীবাদ অভিশাপে পরিণত হতে সময় লাগবে না।

Leave Your Comments