কুতুব মিনার চত্বরের লৌহস্তম্ভে ১৬০০ বছরেও মরিচা ধরেনি, কী কারণে এমন অক্ষত

Date: 2026-06-08
news-banner

লোহা সাধারণত বাতাস, আর্দ্রতা ও বৃষ্টির সংস্পর্শে এলেই ধীরে ধীরে মরিচা ধরে নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু ভারতের রাজধানী দিল্লির কুতুব মিনার কমপ্লেক্সে দাঁড়িয়ে থাকা একটি প্রাচীন লৌহস্তম্ভ এই স্বাভাবিক নিয়মকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে এসেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী।

ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকাভুক্ত কুতুব মিনার চত্বরে অবস্থিত এই প্রায় ৭.২ মিটার উঁচু লৌহস্তম্ভটি প্রায় ১ হাজার ৬০০ বছর ধরে খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে আছে। বিস্ময়করভাবে, এত দীর্ঘ সময় পরও এতে উল্লেখযোগ্য কোনো মরিচা দেখা যায়নি।

সাধারণভাবে লোহা অক্সিজেন ও আর্দ্রতার সংস্পর্শে এসে অক্সিডেশন প্রক্রিয়ায় ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। কিন্তু এই স্তম্ভটি সেই প্রক্রিয়াকে প্রায় অস্বাভাবিকভাবে প্রতিরোধ করে এসেছে।

সিএনএনের এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৩ সালে ভারতের আইআইটি কানপুরের গবেষকেরা এই রহস্যের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেন। তাঁদের গবেষণায় দেখা যায়, স্তম্ভটি তৈরি করা হয়েছিল বিশেষ ধরনের পেটানো লোহা দিয়ে, যেখানে ফসফরাসের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বেশি এবং সালফার ও ম্যাগনেশিয়ামের মতো উপাদান কম ছিল।

গবেষকেরা আরও জানান, প্রাচীন ভারতীয় কারিগরেরা “ফোর্জ ওয়েল্ডিং” নামের একটি প্রযুক্তি ব্যবহার করেছিলেন, যেখানে লোহাকে বারবার উত্তপ্ত করে হাতুড়ি দিয়ে পেটানো হতো। এই প্রক্রিয়ার কারণে ধাতুর গঠনে এমন পরিবর্তন ঘটে যা মরিচা প্রতিরোধে সহায়ক।

এ ছাড়া স্তম্ভটির গায়ে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একটি সুরক্ষামূলক আবরণ তৈরি হয়েছে, যা “মিসাওয়াইট” নামে পরিচিত। লোহা, অক্সিজেন ও হাইড্রোজেনের সমন্বয়ে তৈরি এই স্তরটি ধাতুকে বাইরের পরিবেশের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করে।

গবেষকদের মতে, উচ্চমাত্রার ফসফরাস এবং চুনের অনুপস্থিতিই এই প্রতিরক্ষামূলক স্তর তৈরির প্রধান কারণ। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে বৃষ্টি, রোদ ও আর্দ্রতার মধ্যেও স্তম্ভটি তুলনামূলকভাবে অক্ষত রয়েছে।

লৌহস্তম্ভটির উৎপত্তি নিয়েও রয়েছে নানা মত। ঐতিহাসিকদের মতে, এটি প্রথমে কোথায় নির্মিত হয়েছিল তা নিশ্চিত নয়। ধারণা করা হয়, পরে ত্রয়োদশ শতকে দিল্লি সালতানাতের শাসনামলে এটি কুতুব কমপ্লেক্সে স্থাপন করা হয়।

শিলালিপি বিশ্লেষণে রাজা চন্দ্রের নাম পাওয়া যায়, যেখানে “বিষ্ণুপদগিরি” নামক স্থানের উল্লেখ রয়েছে। তবে এই স্থানটি মথুরা নাকি মধ্যপ্রদেশের উদয়গিরি—এ নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।

আরও একটি প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, এটি দিল্লিতে নিয়ে আসেন তোমর রাজবংশের শাসক অনঙ্গপাল তোমর। তবে আধুনিক গবেষণায় ভিন্ন ভিন্ন তত্ত্ব থাকলেও কোনোটি নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়নি।

ফলে লৌহস্তম্ভটির প্রকৃত উৎস ও দিল্লিতে আগমনের ইতিহাস আজও রহস্যাবৃত।

তবে ইতিহাস ও বিতর্কের বাইরে একটি সত্য পরিষ্কার—প্রায় ১৬০০ বছর ধরে দাঁড়িয়ে থাকা এই লৌহস্তম্ভ প্রাচীন ভারতীয় ধাতুবিদ্যার এক অসাধারণ উদাহরণ, যা আজও বিজ্ঞানীদের বিস্মিত করে চলেছে।

Leave Your Comments