মোঃ মাইন উদ্দিন, কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি:
সময় চলে যায় সময়ের নিয়মে, রয়ে যায় স্মৃতি। একসময় গ্রামবাংলার মাঠ-ঘাট, খেত-খামার আর কাঁচা পথের পরিচিত দৃশ্য ছিল- মাথায় বাঁশের তৈরি ‘পাতলা’ পড়া কাজ করা কৃষক। প্রখর রোদ কিংবা ঝুম বৃষ্টিতে কৃষকের নির্ভরতার একমাত্র প্রতীক ছিল এই পাতলা। যা আধুনিকতার ছোঁয়ায় এবং সহজলভ্য ছাতা, ক্যাপ ও অন্যান্য সামগ্রীর ব্যবহারে ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী এই লোকজ উপকরণ। আর এই পাতলা এখম শুধু প্রবীনদের স্মৃতি।
স্মৃতিচারণে জানা যায়, নব্বইয়ের দশকের আগে এ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাতলার ব্যাপক ব্যবহার ছিল। তখন গ্রামে ছাতার প্রচলন খুব বেশি ছিল না। ফলে কৃষক, জেলে এবং খোলা আকাশের নিচে কাজ করা মানুষদের রোদ-বৃষ্টি থেকে রক্ষা পাওয়ার একমাত্র ভরসা ছিল বাঁশের তৈরি এই পাতলা।
স্থানভেদে পাতলাকে, মাথাল, বাঁশের টুপি কিংবা টোকা নামে পরিচিত ছিল। এই উপকরণটি তৈরি করা হতো মূলত বাঁশের চটা ও গাব পাতা দিয়ে। দক্ষ কারিগরের হাতে বাঁশের সূক্ষ্ম বুনন এবং নান্দনিক নকশার মাধ্যমে তৈরি হতো এর আকৃতি। অনেক ক্ষেত্রে বট পাতাও ব্যবহার করা হতো। সবমিলিয়ে এটিকে আরও মজবুত ও কার্যকর করা হতো।
লোকসংস্কৃতি গবেষকদের মতে, পাতলা শুধু কৃষকের ব্যবহার্য সামগ্রী নয়, এটি ছিল বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ। কৃষিকাজের পাশাপাশি গ্রামীণ জীবনের নানা চিত্রকর্ম, আলোকচিত্র ও লোকসাহিত্যে পাতলার উপস্থিতি লক্ষ করা যায়।
কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার কয়েকজন প্রবীণ কৃষক জানান, চৈত্রের খরতাপে কিংবা বর্ষার বৃষ্টিতে মাঠে কাজ করার সময় পাতলা মাথায় দিলে অনেকটা স্বস্তি পাওয়া যেত। এটি মাথা ও কাঁধের একটি বড় অংশ ঢেকে রাখত, ফলে রোদ ও বৃষ্টির প্রভাব কম পড়ত। একই সঙ্গে বাতাস চলাচলের সুযোগ থাকায় এটি ছিল বেশ আরামদায়ক।
তাদের ভাষ্য, আগে মাঠে কাজ করতে গেলে প্রায় সবাই পাতলা ব্যবহার করতেন। তখন ছাতা ছিল খুবই কম। পাতলা মাথায় দিয়ে সারাদিন কাজ করা যেত। এখন আর সেই পাতলা দেখা যায় না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই এই হস্তশিল্পের কদর কমে যাওয়ার ফলে হারিয়ে গেছে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কারিগরদের পেশাও। নতুন প্রজন্মের আগ্রহ না থাকায় এখন আর কোথাও পাতলা তৈরির কারিগর খুঁজে পাওয়া যায় না।
সংস্কৃতিবিদদের মতে, গ্রামীণ ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে পাতলাকে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। স্থানীয় পর্যায়ে হস্তশিল্প মেলা, সাংস্কৃতিক প্রদর্শনী এবং লোকজ ঐতিহ্যভিত্তিক কর্মসূচির মাধ্যমে এর পরিচিতি বাড়ানো গেলে নতুন প্রজন্মের কাছে এই ঐতিহ্য তুলে ধরা সম্ভব হবে।
বাংলার কৃষিভিত্তিক সভ্যতার সাক্ষী এই পাতলা আজ সময়ের পরিক্রমায় হারিয়ে গেছে। তবুও গ্রামবাংলার স্মৃতিময় অতীতের প্রতীক হয়ে এটি হয়তো এখনও বেঁচে আছে প্রবীণদের স্মৃতিতে, লোকজ সংস্কৃতির ইতিহাসে এবং কোনো এলাকার কিছু কৃষকের মাথায়। তবে ঐতিহ্যের এই নিদর্শন সংরক্ষণ করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানতে পারবে গ্রামীণ জীবনের এক অনন্য অধ্যায়ের কথা।