মায়াবী ‘নয়’ নম্বরের খোঁজে ব্রাজিল: কুনিয়া কি পারবেন রোনালদো হতে
Date: 2026-06-09
নব্বইয়ের দশক কিংবা তারও আগে যাদের জন্ম, ব্রাজিলের ‘নম্বর নাইন’ বললেই তাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক পরিচিত মুখ। টাক মাথা, চওড়া হাসি আর সামনের দুই দাঁতের ফাঁকে আলাদা এক স্বাক্ষর। কিন্তু মাঠে তিনি ছিলেন প্রতিপক্ষের জন্য দুঃস্বপ্ন। সামান্য ফাঁক পেলেই ঢুকে যেতেন বক্সে, মুহূর্তেই বল পাঠাতেন জালে। তিনি Ronaldo Nazário—ফুটবল বিশ্বে যিনি ‘আর নাইন’ নামেই বেশি পরিচিত।
রোনালদোর বিদায়ের পর অনেক স্ট্রাইকার এসেছেন, আবার হারিয়েও গেছেন। কিন্তু তাঁর মতো প্রকৃত ‘নম্বর নাইন’ যেন আর খুঁজে পায়নি ব্রাজিল। ২০২৬ বিশ্বকাপের দুয়ারে দাঁড়িয়ে তাই নতুন করে প্রশ্ন উঠছে—ব্রাজিলের নয় নম্বর জার্সির নতুন দাবিদার Matheus Cunha কি পারবেন দীর্ঘদিনের সেই শূন্যতা পূরণ করতে?
রোনালদোর পর ব্রাজিলের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন বারবার ভেঙেছে। একই সঙ্গে ভুগতে হয়েছে নির্ভরযোগ্য স্ট্রাইকার সংকটে। ২০০৬ বিশ্বকাপে নিজের সেরা সময় পেরিয়ে যাওয়া রোনালদোও করেছিলেন তিন গোল। কিন্তু দল থেমে যায় কোয়ার্টার ফাইনালেই।
২০১০ সালে দায়িত্ব কাঁধে নেন Luís Fabiano। গ্রুপ পর্বে দুই গোল ও শেষ ষোলোতে আরেকটি গোল করলেও শেষ আটের বাধা টপকাতে পারেননি। বিশ্বকাপের আগে দীর্ঘ গোলখরার কারণে সমালোচনার মুখে থাকা ফ্যাবিয়ানো মাঠে কিছুটা জবাব দিলেও ইতিহাসে স্থায়ী ছাপ রাখতে পারেননি।
২০১৪ সালের ঘরের মাঠের বিশ্বকাপ ছিল আরও হতাশার। নয় নম্বর জার্সি ওঠে Fred-এর গায়ে। পুরো আসরে তাঁর অবদান মাত্র একটি গোল। আর জার্মানির কাছে ৭-১ গোলের বিধ্বংসী পরাজয়ের রাতে জার্সিতে মুখ ঢেকে থাকা ফ্রেডের ছবিটাই হয়ে ওঠে ব্রাজিলের ফুটবল ট্র্যাজেডির প্রতীক।
২০১৮ সালে কোচ Tite আধুনিক ফুটবলের চাহিদা অনুযায়ী স্ট্রাইকারের ভূমিকায় পরিবর্তন আনেন। Gabriel Jesus শুধু গোল করার নয়, রক্ষণে সহায়তা ও মাঝমাঠের সঙ্গে সংযোগ তৈরির কাজও করতেন। কিন্তু স্ট্রাইকারের মূল দায়িত্ব—গোল—সেটিই করতে ব্যর্থ হন। পাঁচ ম্যাচ খেলে একটি গোলও করতে পারেননি তিনি।
কাতার বিশ্বকাপে আশার আলো হয়ে এসেছিলেন Richarlison। সার্বিয়ার বিপক্ষে তাঁর দুর্দান্ত বাইসাইকেল কিক ছিল টুর্নামেন্টের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত। তিন গোল করে আলোচনায় এলেও কোয়ার্টার ফাইনালের আগে চোটে পড়ে ছন্দ হারান। শেষ পর্যন্ত ব্রাজিলের বিশ্বকাপ যাত্রাও থেমে যায় শেষ আটেই।
এবার সেই ঐতিহ্যবাহী নয় নম্বর জার্সি উঠছে ম্যাথেউস কুনিয়ার গায়ে। মজার বিষয় হলো, তিনি আদতে প্রথাগত স্ট্রাইকার নন। Manchester United-এ কিংবা আগে Wolverhampton Wanderers-এ খেলেছেন আক্রমণের বিভিন্ন ভূমিকায়। নিজেকে তিনি ‘নাইন পয়েন্ট হাফ’ বলতে পছন্দ করেন—অর্থাৎ নম্বর নাইন ও নম্বর টেনের মাঝামাঝি এক ফুটবলার।
ক্লাব পর্যায়ে কুনিয়ার পারফরম্যান্স প্রশংসিত হলেও জাতীয় দলের হয়ে তাঁর পরিসংখ্যান খুব উজ্জ্বল নয়। ২৩ ম্যাচে মাত্র একটি গোল করেছেন তিনি। তারপরও বর্তমান স্কোয়াডে কোচের আস্থার জায়গায় রয়েছেন কুনিয়াই। যদিও বিকল্প হিসেবে আছেন Igor Thiago, যিনি তুলনামূলকভাবে একজন প্রকৃত সেন্টার ফরোয়ার্ড।
ইতিহাস অবশ্য ব্রাজিলকে একটি স্পষ্ট বার্তাই দেয়—বিশ্বকাপ জিততে হলে তাদের নম্বর নাইনের অসাধারণ পারফরম্যান্স প্রয়োজন। ২০০২ সালে রোনালদো সেটি করেছিলেন। তার আগে ১৯৯৪ সালে Romário-ও একইভাবে দলকে শিরোপার পথে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
এখন অপেক্ষা একটাই—ম্যাথেউস কুনিয়া কি পারবেন রোনালদো ও রোমারিওদের সেই সোনালি উত্তরাধিকার ফিরিয়ে আনতে? নাকি ব্রাজিলের নম্বর নাইন সংকটের ইতিহাসে যুক্ত হবে আরও একটি নতুন অধ্যায়?