প্রকাশ : ২৫ জুলাই ২০২৬
সময়: ১২:৫০ এএম
মেগাপ্রকল্পে ব্যয়ের মহাজাম্প: ডলারের মনগড়া অংক নাকি অনিয়মের বেড়াজাল?
এস আই খান:
২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এখন দেশের মেগাপ্রকল্পের ইতিহাসে ব্যয় বৃদ্ধির এক নতুন মডেলে পরিণত হয়েছে। ২০১৭ সালে ১৭,৫৫৩ কোটি টাকার প্রাক্কলিত ব্যয়ে শুরু হওয়া এই প্রকল্পটির প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার পর আকস্মিকভাবে আরও ৯,৬৯২ কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে, যা মোট ব্যয়ের প্রায় ৫৪ শতাংশ। সরকারের পরিকল্পনা বিভাগের পক্ষ থেকে এই বিপুল ব্যয় বৃদ্ধির স্বপক্ষে যে যুক্তিগুলো দেওয়া হচ্ছে, তা দেশের অর্থনীতিবিদ ও সচেতন মহলে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকির দেওয়া ব্যাখ্যাগুলোকে অনেকেই বাস্তবতাবিবর্জিত ও জনমনে সুশাসনের অভাব ঢাকার চেষ্টা হিসেবে দেখছেন।
ব্যয় বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে সরকারের পক্ষ থেকে ডলারের বিনিময় হারের তারতম্যকে দায়ী করা হলেও বাস্তব পরিসংখ্যান এই দাবিকে খণ্ডন করে। ২০২৪ সালে যখন এই প্রকল্পের গতিপ্রকৃতি নিয়ে আলোচনা চলছিল, তখন ডলারের দর ছিল ১২৪ থেকে ১২৫ টাকা, যা বর্তমানে কমে ১২২ থেকে ১২৩ টাকায় নেমে এসেছে। অর্থনৈতিক নিয়ম অনুযায়ী ডলারের দাম কমলে আমদানিকৃত কাঁচামাল ও বৈদেশিক ঋণের খরচ কমার কথা থাকলেও, এই প্রকল্পটিতে উল্টো ৯ হাজার কোটি টাকারও বেশি ব্যয় বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ডলারের এই নিম্নমুখী প্রবণতার মধ্যেও কীভাবে এত বিশাল অংকের ব্যয় বৃদ্ধি ঘটল, তার কোনো যৌক্তিক বা বৈজ্ঞানিক সূত্র মেলাতে পারছেন না বিশেষজ্ঞরা।
খরচ বাড়ার দ্বিতীয় কারণ হিসেবে নতুন কিছু ভৌত কাঠামো সংযোজনের কথা বলা হলেও এর কোনো সুনির্দিষ্ট বিবরণ জনগণের সামনে প্রকাশ করা হয়নি। অনুসন্ধানে জানা গেছে, নতুন কাজের মধ্যে মূলত বাইপাইল এলাকায় সিগন্যাল এড়ানোর জন্য একটি বাইপাইল ট্রাম্পেট ইন্টারচেঞ্জ নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে, মাত্র একটি ইন্টারচেঞ্জ এবং কিছু আনুষঙ্গিক কাজের জন্য কীভাবে ৯,৬৯২ কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব। বাংলাদেশের যোগাযোগের অন্যতম মাইলফলক পদ্মা সেতুর মূল কাঠামো নির্মাণে যেখানে খরচ হয়েছিল প্রায় ১২,১৩৩ কোটি টাকা, সেখানে মাত্র একটি ইন্টারচেঞ্জের ব্যয় প্রায় একটি আস্ত পদ্মা সেতুর মূল খরচের কাছাকাছি চলে যাওয়া চরম আর্থিক অনিয়ম ও অস্বচ্ছতার ইঙ্গিত দেয়।
বর্তমান সংশোধিত প্রাক্কলন অনুযায়ী, এই এক্সপ্রেসওয়ের প্রতি কিলোমিটারের নির্মাণ ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১,১৩৫ কোটি টাকা, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। বর্তমান প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা যখন প্রায়শই দেশের বিভিন্ন মঞ্চে দাঁড়িয়ে একাধিক পদ্মা সেতু বানিয়ে ফেলার রাজনৈতিক বক্তব্য দেন, তখন এই প্রকল্পের খরচের এমন অস্বাভাবিক উল্লম্ফন সেই সব দাবিকে চরম পরিহাসে পরিণত করেছে। ৮০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর এই ধরনের আকাশচুম্বী ব্যয় বৃদ্ধি হয়তো শুরুতে করা ভুল ও অপরিপক্ক পরিকল্পনার ফসল, অথবা প্রকল্পের শেষ সময়ে এসে জনগণের করের টাকা অপচয়ের এক সুনিপুণ কৌশল।
বিমানবন্দর–আব্দুল্লাহপুর–আশুলিয়া–জিরাবো–বাইপাইল–নবীনগর হয়ে ঢাকা ইপিজেড পর্যন্ত বিস্তৃত এই এক্সপ্রেসওয়েটি দেশের অর্থনীতি ও ঢাকা-উত্তরবঙ্গ সড়ক যোগাযোগের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি একদিকে চন্দ্রা এক্সপ্রেসওয়ে এবং অন্যদিকে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে চন্দ্রা থেকে যাত্রাবাড়ী পর্যন্ত একটি নিরবচ্ছিন্ন সিগন্যালমুক্ত নেটওয়ার্ক তৈরি করার কথা। তবে এই অপরিহার্য ও জনগুরুত্বপূর্ণ মেগাপ্রকল্পটিকে যেভাবে অপচয়ের চারণভূমি বানানো হয়েছে, তা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর একটি বিশাল চাপ তৈরি করছে। নতুন সংযোজনের আড়ালে ঠিক কোন কোন খাতে এই বিপুল অর্থ ব্যয় দেখানো হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখতে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটির মাধ্যমে পুঙ্খানুপুঙ্খ অডিট করা এখন সময়ের দাবি।