ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার অন্তত তিনটি এলাকায় মাদক ব্যবসার অভিযোগ তুলে কয়েকজনের ওপর হামলা, বাড়িঘর ভাঙচুর এবং তাদের এলাকা ছাড়তে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে। গত শুক্রবার ভাঙ্গা পৌরসভার চণ্ডীদাসদী মহল্লা, হামিরদী ইউনিয়নের হামিরদী গ্রাম এবং মানিকদহ ইউনিয়নের ব্রাহ্মণপাড়া গ্রামে পৃথকভাবে এসব ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ‘সচেতন যুবসমাজ’ ব্যানারে সংঘটিত এসব ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের কাউকেই পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়নি। বরং তাদের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং প্রকাশ্যে মারধরের ঘটনা ঘটেছে। ঘটনাগুলো প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃশ্যমান কোনো ভূমিকা দেখা যায়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বাড়িঘর ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ
শুক্রবার সকালে ভাঙ্গা পৌরসভার চণ্ডীদাসদী মহল্লায় আইয়ুব শেখের মালিকানাধীন দুটি ভবনে হামলা চালানো হয়। হামলাকারীরা শাবল, হাতুড়ি ও লোহার রড দিয়ে ভবন দুটির বিভিন্ন অংশ ভেঙে ফেলে। এ সময় ঘরের আসবাবপত্র তছনছ করে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
স্থানীয়দের দাবি, আইয়ুব শেখ ও তাঁর স্ত্রী ময়না বেগম দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তবে ঘটনার পর থেকে তারা আত্মগোপনে থাকায় তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রকাশ্যে মারধর, পরিবারসহ এলাকা ত্যাগ
একই দিন বিকেলে মানিকদহ ইউনিয়নের ব্রাহ্মণপাড়া গ্রামে মাদক ব্যবসার অভিযোগে সালেহ আহমেদ নামে এক ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে মারধর করা হয়। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েকজন ব্যক্তি তাঁকে লাঠি, ঘুষি ও লাথি দিয়ে আঘাত করছেন।
ঘটনার পর সালেহ আহমেদ ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন। তাঁদের বাড়ি বর্তমানে তালাবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সালেহ আহমেদ মাদক ও হত্যা মামলার আসামি এবং সম্প্রতি জামিনে মুক্ত হয়ে এলাকায় ফিরে এসেছিলেন। তবে তাঁকে পুলিশের হাতে না তুলে মারধর করার বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সালিসে এলাকা ছাড়ার নির্দেশ
শুক্রবার সন্ধ্যায় হামিরদী গ্রামে বিষা মুন্সী নামে আরেক ব্যক্তিকে মাদক ব্যবসার অভিযোগে মারধর করা হয়। পরে স্থানীয় একটি সালিস বৈঠকে তাঁকে ১২ ঘণ্টার মধ্যে এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
পরদিন তাঁর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়িটি তালাবদ্ধ এবং পরিবারসহ তিনি এলাকা ত্যাগ করেছেন।
পুলিশের বক্তব্য
ভাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মিজানুর রহমান বলেন, মাদকবিরোধী অভিযানের নামে কয়েকটি স্থানে মারধর ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। তবে এ বিষয়ে থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ জমা পড়েনি।
তিনি জানান, ভবিষ্যতে এ ধরনের মব সৃষ্টি এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনা প্রতিরোধে পুলিশের বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে। কোনো ঘটনা জানার ১৫ মিনিটের মধ্যে ওই টিম ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।
আইন হাতে তুলে না নেওয়ার আহ্বান
ঘটনার পর ফরিদপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য Shahidul Islam Babul সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, মাদকবিরোধী কর্মসূচির নামে বাড়িঘর ভাঙচুর বা অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মারধর কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
এদিকে ভাঙ্গা উপজেলা বিএনপির সভাপতি Khandaker Iqbal Hossain বলেন, কাউকে আইন নিজের হাতে তুলে নিতে দেওয়া হবে না এবং প্রশাসনকে এ বিষয়ে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে বলা হয়েছে।
টিআইবির অনুপ্রেরণায় গঠিত Faridpur Sachetan Nagorik Committee-এর সভাপতি শিপ্রা রায় বলেন, কারও বিরুদ্ধে মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকলে আইনগত প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়াই সভ্য সমাজের রীতি। মব সৃষ্টি করে বিচার করার প্রবণতা সমাজে আরও অস্থিরতা ও অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে পারে।