৪৫ বছর ধরে লোহা পিটিয়ে জীবন চালানো শ্রীবাসের এখন কঠিন সময়
Date: 2026-06-09
নিজস্ব প্রতিনিধি :
মানিকগঞ্জ পৌর এলাকার বড় সরুন্ডি গ্রামের বাসিন্দা শ্রীবাস দাসের বয়স এখন ৬৭ বছর। জীবনের প্রায় ৪৫ বছর তিনি কাটিয়েছেন আগুনের ভাট্টি, হাতুড়ি আর লোহা পেটানোর শব্দের মধ্যে। একসময় তাঁর তৈরি দা, কাস্তে ও কৃষিকাজের নানা সরঞ্জামের ব্যাপক চাহিদা ছিল। দিনভর কাজ করেও অর্ডার শেষ করা যেত না। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই ব্যস্ততা এখন অনেকটাই অতীত।
রোববার দুপুরে বড় সরুন্ডি গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, পূর্ব দাশড়া-বকজুরী সড়কের পাশে টিনের ছাউনি দেওয়া ছোট্ট একটি কামারশালায় বসে কাজ করছেন শ্রীবাস দাস। সামনে জ্বলছে কয়লার চুল্লি, পাশে সাজানো হাতুড়ি, সাঁড়াশি ও অন্যান্য সরঞ্জাম। আগুনে লোহা লাল করে সেটিকে পিটিয়ে প্রয়োজনীয় আকার দিচ্ছেন তিনি। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে এলেও পেশার প্রতি ভালোবাসা ও নিষ্ঠা আজও অটুট।
শ্রীবাস দাস জানান, তরুণ বয়সে মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড এলাকার দলিল মার্কেটের সামনে কামারের কাজ শুরু করেন। পরে বাসস্ট্যান্ডের পদ্মা পাম্প এলাকা এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের সামনে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। প্রায় পাঁচ বছর আগে বয়স ও যাতায়াতের সুবিধার কথা বিবেচনা করে বাড়ির কাছেই একটি ছোট কর্মশালা গড়ে তোলেন।
অতীত স্মরণ করে তিনি বলেন, “আগে বিদ্যুৎ ছিল না। ভাপি দিয়ে বাতাস চালিয়ে কয়লার আগুন জ্বালাইতাম। কৃষকেরা দা, কাস্তে আর কোদাল বানানোর জন্য লাইন দিয়া দাঁড়াইয়া থাকত। দিনভর কাজ করেও অর্ডার শেষ করতে পারতাম না।”
বর্তমানে একটি দা তৈরি করতে তাঁর খরচ হয় এক হাজার থেকে বারোশ টাকা। একটি কাস্তে তৈরির মজুরি ৩০০ টাকা। দা ধার করার জন্য নেন ১০০ টাকা এবং কাস্তে ধার করার জন্য ৪০ থেকে ৫০ টাকা। তবে কাজের পরিমাণ আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে।
শ্রীবাস দাস বলেন, “আগে প্রতিদিন ৪০০-৫০০ টাকা আয় হইত, তখন বাজারদরও কম ছিল। এখন অনেক দিন ৩০০-৪০০ টাকার বেশি আয় হয় না। কোনো কোনো দিন আবার বসেই থাকতে হয়। মানুষ এখন বাজার থেইকা তৈরি দা-কাস্তে কিনে নেয়। তাই কামারের কাছে আগের মতো আসে না। আয় কমছে, কিন্তু সংসারের খরচ বেড়েই চলেছে।”
শ্রীবাস দাসের স্ত্রী অঞ্জলী দাস দীর্ঘদিন ধরে তাঁর সংগ্রামের সঙ্গী। তিনি বলেন, “এই কাজ করেই সংসার চলেছে, সন্তানদের বড় করেছি। এখন ছেলেমেয়েদের নিজেদের সংসার আছে। যার যার সংসার সামলাতেই কষ্ট হয়।”
দম্পতির দুই ছেলে ও এক মেয়ে। বড় ছেলে প্রকাশ দাস একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন এবং ছোট ছেলে প্রবীর দাস টাইলস মিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কর্মরত। একমাত্র মেয়ে অনিতা দাসের বিয়ে হয়েছে কয়েক বছর আগে।
স্থানীয় কৃষক খোরশেদ আলী বলেন, “বাজারে যে কাস্তে পাওয়া যায়, সেগুলোর লোহা ভালো না। ধারও বেশিদিন থাকে না। শ্রীবাস দাসের বানানো কাস্তের মান অনেক ভালো।”
প্রযুক্তির অগ্রগতি ও বাজারে তৈরি সরঞ্জামের সহজলভ্যতায় ঐতিহ্যবাহী কামারশিল্পের কদর কমে গেছে। তবু শ্রীবাস দাস আশা ছাড়েননি। প্রতিদিন সকালে কর্মশালার দরজা খুলে আগুন জ্বালান। কেউ দা ধার করাতে আসেন, কেউ কাস্তে বানানোর অর্ডার দেন। কাজ কম হলেও নিষ্ঠার সঙ্গে তা করে যান তিনি।
কারণ, কামারের এই পেশাই তাঁর পরিচয়, এই পেশাই তাঁর জীবনের অবলম্বন।