বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক অস্ত্রে ব্যয় রেকর্ড বেড়েছে: গবেষণা

Date: 2026-06-09
news-banner

বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক অস্ত্র নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও আধুনিকীকরণে ব্যয় গত বছর রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলো তাদের অস্ত্রভান্ডার থেকে আরও বেশি ওয়ারহেড সক্রিয় মোতায়েন ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করছে বলে জানিয়েছে গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বিশ্ব নতুন এক পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার দিকে এগোচ্ছে।

পারমাণবিক অস্ত্র বিলোপে কাজ করা International Campaign to Abolish Nuclear Weapons (আইক্যান) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বিশ্বের ৯টি পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ সম্মিলিতভাবে প্রায় ১১ হাজার ৯০০ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয় করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১৯ শতাংশ বেশি।

প্রতিবেদনটিতে সতর্ক করে বলা হয়েছে, বিশ্ব এখন নতুন একটি পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে।

অন্যদিকে Stockholm International Peace Research Institute (সিপ্রি) প্রকাশিত পৃথক এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে পারমাণবিক ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে। উভয় প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বিভিন্ন দেশ তাদের পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার আধুনিকীকরণ এবং নতুন অস্ত্র মোতায়েনের প্রস্তুতি জোরদার করায় ব্যয় দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

আইক্যানের কর্মসূচি পরিচালক Susi Snyder বলেন, পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডারের সম্প্রসারণ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাঁর মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

কমছে মোট সংখ্যা, বাড়ছে ব্যবহারযোগ্য অস্ত্র

সিপ্রির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরুতে বিশ্বে মোট পারমাণবিক ওয়ারহেডের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ১৮৭টি, যা কয়েক দশকের ধারাবাহিক হ্রাসের ফল। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, ব্যবহারযোগ্য ও মোতায়েনযোগ্য ওয়ারহেডের সংখ্যা বেড়ে ৯ হাজার ৭৪৫-এ পৌঁছেছে।

সিপ্রির পরিচালক Dan Smith-এর নেতৃত্বাধীন গবেষণায় বলা হয়েছে, পারমাণবিক অস্ত্রের মোট সংখ্যা কমলেও ঝুঁকি ও বিপদের মাত্রা বাড়ছে। অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তির দুর্বলতা এবং পরাশক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা এ ঝুঁকিকে আরও তীব্র করছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার আধিপত্য, দ্রুত এগোচ্ছে চীন

বর্তমানে বিশ্বের মোট পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডারের প্রায় ৮৩ শতাংশ রয়েছে United StatesRussia-এর হাতে। দুই দেশের কাছেই ৫ হাজারের বেশি ওয়ারহেড রয়েছে।

তবে সবচেয়ে দ্রুতগতিতে অস্ত্রভান্ডার সম্প্রসারণ করছে China। সিপ্রির হিসাব অনুযায়ী, দেশটির কাছে বর্তমানে প্রায় ৬২০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে এবং ভবিষ্যতে এ সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

আইক্যানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের পাশাপাশি United Kingdom, France, India, Pakistan, Israel এবং North Korea-ও তাদের পারমাণবিক কর্মসূচিতে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে।

ব্যয়ে শীর্ষে যুক্তরাষ্ট্র

আইক্যানের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচিতে সবচেয়ে বেশি ব্যয় করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির ব্যয় ছিল প্রায় ৬ হাজার ৯২০ কোটি ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ১ হাজার ২৪০ কোটি ডলার বেশি।

ব্যয়ের দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে চীন, যার ব্যয় প্রায় ১ হাজার ৩৫০ কোটি ডলার। এরপর রয়েছে যুক্তরাজ্য (১ হাজার ২৬০ কোটি ডলার) এবং রাশিয়া (প্রায় ৯৫০ কোটি ডলার)।

গত পাঁচ বছরে এই ৯টি দেশ সম্মিলিতভাবে পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডারের পেছনে ৪৭ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি ব্যয় করেছে।

দীর্ঘমেয়াদি অস্ত্র পরিকল্পনা

প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স আগামী শতাব্দীতেও পারমাণবিক অস্ত্রব্যবস্থা উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণে বিপুল বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে।

বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন Sentinel Intercontinental Ballistic Missile কর্মসূচি ২১০০ সালের পরও সক্রিয় থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পাশাপাশি প্লুটোনিয়াম উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে বর্তমান ওয়ারহেডগুলো আরও দীর্ঘ সময় কার্যকর রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে।

গবেষকদের ধারণা, ২০২৫ থেকে ২০৩৪ সালের মধ্যে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক অস্ত্র খাতেই প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় হতে পারে।

মানবিক খাতে প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ

গবেষকরা বলছেন, এমন সময়ে পারমাণবিক অস্ত্রের পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে, যখন বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মানবিক সহায়তা কর্মসূচি তহবিল সংকটে ভুগছে।

আইক্যানের হিসাব অনুযায়ী, গত বছর পারমাণবিক অস্ত্রের পেছনে এক দিনে যে অর্থ ব্যয় করা হয়েছে, তা দিয়ে ২০ লাখের বেশি মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব ছিল।

সুসি স্নাইডার বলেন, অনেক দেশ স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা ও মানবিক সহায়তার পরিবর্তে এমন অস্ত্রব্যবস্থায় বিনিয়োগ করছে, যার ব্যবহার ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন লঙ্ঘনের ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।

Leave Your Comments