তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়ন পরিষদে সেবা নাকি অনিয়মের জাল?

Date: 2026-06-17
news-banner

আতিকুর রহমান, ক্রাইম রিপোর্টার-

‎স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তর ইউনিয়ন পরিষদ। জনগণের দোরগোড়ায় নাগরিক সেবা পৌঁছে দেওয়া, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং জনসাধারণের অধিকার রক্ষাই এর মূল লক্ষ্য। কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠানকে ঘিরেই যখন ওঠে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ, তখন প্রশ্নের মুখে পড়ে পুরো সেবাব্যবস্থা।

‎ঢাকার সাভার উপজেলার তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়ন পরিষদকে ঘিরে সম্প্রতি এমনই নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে ইউনিয়ন পরিষদের বিভিন্ন সেবা গ্রহণে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।

‎অভিযোগ রয়েছে, জন্ম নিবন্ধন, মৃত্যু নিবন্ধন, নাগরিক সনদ, ওয়ারিশ সনদ ও ট্রেড লাইসেন্সসহ বিভিন্ন সেবা পেতে সাধারণ আবেদনকারীদের দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হয়। তবে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে গেলে দ্রুত কাজ সম্পন্ন হয় বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।


‎স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা অভিযোগ করেন, ইউনিয়ন পরিষদকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী দালালচক্র সক্রিয় রয়েছে। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, স্থানীয় কিছু সংবাদকর্মী এবং প্রভাবশালী মহলের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এ চক্র প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ছত্রছায়ায় পরিচালিত হচ্ছে বলে তাদের দাবি।

‎এমনকি অনুসন্ধানী সাংবাদিকরা এলাকায় তথ্য সংগ্রহে গেলে তাদের কার্যক্রমে বিভিন্নভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।


‎তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়ন পরিষদের সচিব মো. আমির হোসেনের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রশাসনিক অনিয়ম এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও উঠেছে।

‎অভিযোগ অনুযায়ী, ১৪তম গ্রেডের সরকারি কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও তার মালিকানায় সাভারের ভাগুতা দুদু মার্কেট সংলগ্ন এলাকায় দুটি বহুতল বাড়ি রয়েছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, একটি প্রায় ১৫ কাঠা জমির ওপর নির্মিত তিনতলা ভবন এবং অন্যটি প্রায় ৪ কাঠা জমির ওপর নির্মিত দুইতলা বাড়ি। এছাড়া তার নামে-বেনামে আরও সম্পদ থাকার অভিযোগও রয়েছে।

‎স্থানীয়দের প্রশ্ন, সরকারি বেতন-ভাতার সঙ্গে এসব সম্পদের সামঞ্জস্য কতটুকু এবং সম্পদের উৎস কী?


‎সম্প্রতি সাভারের জোরপুল এলাকায় একটি ড্রেনেজ প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি বিধি অনুযায়ী টেন্ডারের মাধ্যমে কাজ বাস্তবায়নের কথা থাকলেও প্রকল্পটি যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে সরাসরি সচিবের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।


‎অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করতে একটি অনুসন্ধানী টিম তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়ন পরিষদে গেলে সেখানে ভিন্ন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়।

‎প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, টিমের উপস্থিতির কিছু সময়ের মধ্যেই স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও কয়েকজন সংবাদকর্মী ইউনিয়ন পরিষদে জড়ো হন। তারা অনুসন্ধানী কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং সচিবের পক্ষে অবস্থান নেন।

‎অভিযোগ রয়েছে, সচিব আমির হোসেনের বক্তব্য নেওয়ার জন্য কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করলেও তার সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়নি। বরং স্থানীয় কিছু সংবাদকর্মী ও রাজনৈতিক নেতারা তাকে ঘিরে রাখেন।

‎একপর্যায়ে অনুসন্ধানী দলের সদস্যদের সঙ্গে কয়েকজন সংবাদকর্মী ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীর উত্তপ্ত বাকবিতণ্ডা হয়। অনুসন্ধানী দলের দাবি, তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয় এবং শারীরিকভাবে হেনস্তার চেষ্টা করা হয়।

‎পরবর্তীতে মোটরসাইকেলে করে আসা কয়েকজন ব্যক্তি সচিবকে সেখান থেকে সরিয়ে নিতে সহায়তা করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

‎একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর অভিযোগের তদন্ত বা অনুসন্ধানে কেন বাধা সৃষ্টি করা হলো—এ প্রশ্ন এখন স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

‎সুশাসন বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে জনগণের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য গ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।

‎স্থানীয়দের দাবি, তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়ন পরিষদে সেবা কার্যক্রম, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, আর্থিক লেনদেন এবং সচিবের সম্পদের উৎস নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

তাদের মতে, অভিযোগগুলো সত্য না মিথ্যা—তা নির্ধারণ করবে তদন্ত। তবে জনস্বার্থে বিষয়গুলোর স্বচ্ছ অনুসন্ধান এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি

Leave Your Comments