আব্দুল্লাহ্ আল মামুন, পঞ্চগড় প্রতিনিধি:
আশুরার পরদিনই যেন বদলে যায় পঞ্চগড় সদর উপজেলার গড়িনাবাড়ী ইউনিয়নের শেখপাড়া গ্রামের চিরচেনা রূপ। গ্রামের কাঁচা সড়কের দুই পাশে সারি সারি দোকান, মানুষের ঢল, শিশুদের উচ্ছ্বাস আর গ্রামীণ উৎসবের আবহে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। শত বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা ঐতিহ্যবাহী ‘পাগলির মেলা’ উপলক্ষে জেলার বিভিন্ন প্রান্ত ছাড়াও দূর-দূরান্ত থেকে হাজারো মানুষের সমাগম ঘটে এখানে।
প্রতি বছর হিজরি সনের মহররম মাসের ১১ তারিখ, অর্থাৎ পবিত্র আশুরার পরদিন বসে একদিনের এই ঐতিহ্যবাহী মেলা। নির্দিষ্ট মাঠ না থাকায় শেখপাড়া গ্রামের কাঁচা সড়কের দুই পাশজুড়েই বসে অস্থায়ী দোকানপাট। দুপুর গড়াতেই বাড়তে থাকে মানুষের ভিড়, আর বিকেলের দিকে পুরো এলাকা পরিণত হয় এক প্রাণবন্ত জনসমুদ্রে।
মেলায় আসে নানা বয়সী মানুষের জন্য আকর্ষণীয় সব পণ্য। জিলাপি, মিষ্টান্ন, মুড়ি-মুড়কি, খেলনা, রঙিন বেলুন, বাঁশি, কুটিরশিল্প ও মৃৎশিল্পের সামগ্রী নিয়ে বসেন অসংখ্য ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। কেনাকাটা, ঘোরাঘুরি আর শিশুদের হাসি-আনন্দে দিনভর প্রাণ ফিরে পায় শেখপাড়া।
স্থানীয়দের মতে, বহু বছর আগে আমিরন নামে এক মানসিক ভারসাম্যহীন নারী এই গ্রামে বসবাস করতেন। আশুরার সময় তিনি গ্রামবাসীকে কারবালার হৃদয়বিদারক ঘটনা এবং ইমাম হাসান (রা.) ও ইমাম হোসাইন (রা.)-এর স্মরণে রচিত মার্সিয়া আবেগভরে শুনাতেন। তার সেই বর্ণনায় মানুষ আবেগাপ্লুত হতেন। মৃত্যুর পর গ্রামবাসী তাকে গ্রামের সড়কের পাশে সমাহিত করেন। পরে তার কবরকে কেন্দ্র করে দোয়া, ফাতেহা পাঠ ও মানত করার প্রচলন শুরু হয়। সময়ের পরিক্রমায় সেই আয়োজনই আজকের ‘পাগলির মেলা’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
মেলায় আসা দর্শনার্থী আফসানা শারমিন বলেন, এটি শুধু একটি মেলা নয়, আমাদের এলাকার দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও বিশ্বাসের প্রতীক। প্রতিবছর পরিবার নিয়ে এখানে আসি। কেউ দোয়া করেন, কেউ মানত পূরণ করেন, আবার অনেকেই শুধু এই শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী আয়োজন উপভোগ করতে আসেন।
স্থানীয় স্কুলশিক্ষক আতাউর রহমান বলেন, পাগলির মেলা শেখপাড়ার ইতিহাস ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই আয়োজন ধর্মীয় অনুভূতির পাশাপাশি গ্রামীণ লোকসংস্কৃতি, সামাজিক সম্প্রীতি ও ঐতিহ্যেরও ধারক। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।
লোকবিশ্বাস, ধর্মীয় আবেগ এবং গ্রামীণ সংস্কৃতির অনন্য সমন্বয়ে গড়ে ওঠা শেখপাড়ার ‘পাগলির মেলা’ আজ শুধু একটি বার্ষিক আয়োজন নয়; এটি পঞ্চগড়ের ঐতিহ্য, ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রতীক, যা প্রতিবছরই হাজারো মানুষকে এক সুতোয় গেঁথে দেয়।