নিজস্ব প্রতিবেদক :
দেশের গুরুত্বপূর্ণ জরুরি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর-কে ঘিরে নতুন করে প্রশ্নের ঝড় উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন দুই বিতর্কিত কর্মচারী, ফায়ার ফাইটার মোঃ সাদ্দাম হোসেন এবং সাময়িক বরখাস্তকৃত ওয়্যারহাউজ ইন্সপেক্টর মোঃ রেজায়ে রাব্বী। দুর্নীতি, তদবির বাণিজ্য, প্রশাসনিক প্রভাব, সরকারি সুযোগ-সুবিধার অপব্যবহার এবং সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য হুমকির মতো গুরুতর অভিযোগ ওঠার পরও কেন তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সম্প্রতি বিভিন্ন অনলাইন সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই দুই কর্মচারীর বিরুদ্ধে একের পর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে ফায়ার সার্ভিস অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। কিন্তু অভিযোগ তদন্ত বা প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়ার পরিবর্তে উল্টো সংবাদ প্রকাশকারী সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হুমকি, ভয়ভীতি, চক্রান্ত এবং পাল্টা অপপ্রচারের অভিযোগ উঠেছে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে। এতে করে শুধু গণমাধ্যম নয়, সরকারি চাকরিবিধি ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
“সামান্য ফায়ার ফাইটার”, নাকি সচিবালয়ের অঘোষিত ক্ষমতাধর?
ফায়ার ফাইটার মোঃ সাদ্দাম হোসেনকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচিত প্রশ্ন হলো, একজন সাধারণ কর্মচারী কীভাবে বছরের পর বছর সচিবালয়ে অবাধ বিচরণ, প্রভাব বিস্তার এবং তদবির বাণিজ্যের মতো কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন?
অভিযোগ রয়েছে, কাগজে-কলমে তিনি ফায়ার সার্ভিসের মাঠপর্যায়ের সদস্য হলেও বাস্তবে তার অধিকাংশ সময় কেটেছে সচিবালয়কেন্দ্রিক যোগাযোগ, দালালি, তদবির ও ক্ষমতার বলয় তৈরিতে। বিভিন্ন সচিব, উপসচিব এবং প্রভাবশালী প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে বদলি, পদোন্নতি এবং প্রশাসনিক সুবিধা আদায়ের নামে দীর্ঘদিন ধরে একটি অদৃশ্য সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, গত ছয় থেকে সাত বছর ধরে তিনি নিয়মিত কর্মস্থলে উপস্থিত না থেকেও বহাল তবিয়তে চাকরি করে গেছেন। প্রশ্ন উঠেছে, একজন সাধারণ ফায়ার ফাইটার কীভাবে দিনের পর দিন দায়িত্বস্থলে অনুপস্থিত থেকেও প্রশাসনিক ব্যবস্থা এড়িয়ে যান? তার অনুপস্থিতির বিষয়ে কি কোনো হাজিরা যাচাই হয়নি? কোনো বিভাগীয় তদন্ত হয়নি? নাকি প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় সবকিছু ধামাচাপা পড়ে গেছে?
আরও বিস্ময়কর অভিযোগ হলো, তিনি নাকি সচিবালয় ও ফায়ার সার্ভিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের গোপন নথি বিভিন্ন সাংবাদিকের কাছে ফাঁস করতেন এবং সেগুলোকে ভয়ভীতি প্রদর্শনের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতেন। অতীতেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক উপসচিবের বিরুদ্ধে তথ্য ফাঁস করে সংবাদ প্রকাশ করানোর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। যদি এসব অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের নথি একজন নিম্নপদস্থ কর্মচারীর হাতে কীভাবে পৌঁছায়?
কোটি টাকার সম্পদ, বিলাসী জীবন আর রহস্যময় উত্থান
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিভিন্ন মন্ত্রী-এমপিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের সুযোগে সাদ্দাম হোসেন বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে দুটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, একাধিক ব্যক্তিগত গাড়ি, অভিজাত রেস্টুরেন্টে নিয়মিত আড্ডা-বৈঠক, বিমানযোগে ঘন ঘন যাতায়াত এবং অত্যন্ত ব্যয়বহুল জীবনযাপন নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সহকর্মীরাই।
একজন ফায়ার ফাইটারের সরকারি বেতন কাঠামো বিবেচনায় এমন জীবনযাপন কতটা বাস্তবসম্মত? তার আয়কর নথি, সম্পদের হিসাব এবং ব্যাংক লেনদেন কি কখনো খতিয়ে দেখা হয়েছে? যদি না হয়ে থাকে, তাহলে কেন হয়নি?
অভিযোগ রয়েছে, নারী কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ব্যবহার করেও তিনি প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার করতেন। বিভিন্ন কর্মকর্তার নাম ভাঙিয়ে ভয়ভীতি দেখানো, বদলি ও পদোন্নতির তদবিরের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন এবং ক্ষমতার দাপট দেখানোর অভিযোগও দীর্ঘদিন ধরে ভেসে বেড়াচ্ছে।
তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, একজন সাধারণ কর্মচারীর বিরুদ্ধে এত অভিযোগ জমা হওয়ার পরও কেন তাকে ঘিরে প্রশাসনের রহস্যজনক নীরবতা?
সংবাদ প্রকাশের পর সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হুমকি!
সবচেয়ে উদ্বেগজনক অভিযোগ হলো, এই দুই কর্মচারীর বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর তারা সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সরাসরি হুমকি ও চক্রান্ত শুরু করেছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তারা কর্মস্থলে না থেকে সচিবালয়, জাতীয় প্রেসক্লাব এবং বিভিন্ন মিডিয়া হাউসে ঘুরে ঘুরে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছেন।
এমন আচরণ সরাসরি সরকারি চাকরিবিধির পরিপন্থী বলে মনে করছেন প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞরা। সরকারি চাকরি আইন অনুযায়ী, অনুমতি ছাড়া গণমাধ্যমে পাল্টা বক্তব্য দেওয়া, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে চক্রান্তের অভিযোগ তোলা কিংবা প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে ভীতি সৃষ্টি করা ‘অসদাচরণ’ হিসেবে গণ্য হতে পারে।
চাকরিবিধি নিয়ম অনুযায়ী:
••অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিতে হয়,
••তদন্ত কমিটি গঠন করতে হয়,
••নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে হয়,
এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে পদাবনতি, বাধ্যতামূলক অবসর কিংবা চাকরিচ্যুতির মতো কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এসব নিয়ম কি শুধু কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ? ফায়ার সার্ভিস প্রশাসন কি এই অভিযোগগুলো দেখেও না দেখার ভান করছে?
“দুর্নীতির ক্যাশিয়ার” রেজায়ে রাব্বীকে ঘিরে নতুন বিতর্ক:
অন্যদিকে ওয়্যারহাউজ ইন্সপেক্টর মোঃ রেজায়ে রাব্বীর বিরুদ্ধেও রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। সরকারি কোয়ার্টার ভাড়া দেওয়া, প্রভাব খাটিয়ে পদায়ন বাণিজ্য, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার, আন্দোলনকালীন বিতর্কিত ভূমিকা এবং প্রশাসনিক সুবিধা ভোগের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই ঘুরে বেড়াচ্ছে।
সূত্র বলছে, তিনি দীর্ঘদিন ধরে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ লাইসেন্সিং এলাকায় দায়িত্ব পালনকালে প্রভাবশালী একটি বলয়ের সদস্যে পরিণত হন। আচরণগত অভিযোগে একাধিকবার বদলি করা হলেও রহস্যজনকভাবে তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় দায়িত্বস্থলে অনুপস্থিত থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে অবস্থান নেওয়ার ঘটনাও তাকে বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে আসে। পরে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলেও সেই সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকর হয়েছে, সেটিও এখন প্রশ্নের মুখে।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো সরকারি কোয়ার্টার ভাড়া দেওয়া। অভিযোগ রয়েছে, নিজের নামে বরাদ্দকৃত সরকারি বাসা অন্যের কাছে ভাড়া দিয়ে নিয়মিত অর্থ আদায় করতেন তিনি। এমনকি চাকরিচ্যুত এক ফায়ার ফাইটারের কাছেও সেই কোয়ার্টার ভাড়া দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
যদি এসব অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে এটি শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম নয়, রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহারও বটে।
তাহলে প্রশাসন নিশ্চুপ কেন?
সংশ্লিষ্ট মহলে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এত অভিযোগ, এত বিতর্ক, এত প্রকাশ্য চাকরিবিধি লঙ্ঘনের পরও কেন অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেই?
ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কেন নীরব? সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য হুমকি দেওয়া সত্ত্বেও কেন বিভাগীয় তদন্ত শুরু হচ্ছে না? অভিযোগকারীদের বদলে অভিযুক্তরাই কেন প্রভাবশালী অবস্থানে থাকছেন?
অনেকের আশঙ্কা, প্রশাসনের ভেতরেই হয়তো একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে, যারা একে অপরকে রক্ষা করছে। না হলে একজন সাধারণ ফায়ার ফাইটার কীভাবে সচিবালয়ে প্রভাব বিস্তার করেন? কীভাবে একজন সাময়িক বরখাস্ত কর্মকর্তা আবারও গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন পান? কীভাবে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে হুমকি দিয়েও তারা বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়ান?
সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি প্রশ্নের মুখে;
বিশ্লেষকদের মতে, একটি গুরুত্বপূর্ণ সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত না হলে সাধারণ জনগণের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ফায়ার সার্ভিসের মতো প্রতিষ্ঠানে যেখানে প্রতিটি সদস্যের দায়িত্ব জীবন রক্ষা করা, সেখানে যদি দুর্নীতি, তদবির, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ভয়ভীতির সংস্কৃতি জায়গা করে নেয়, তবে তা পুরো প্রতিষ্ঠানের জন্যই অশনিসংকেত।
এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট প্রশাসন এই অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়, নাকি আগের মতোই নীরবতা বজায় রাখে। কারণ নীরবতা অনেক সময় শুধু উদাসীনতা নয়, যোগসাজশেরও ইঙ্গিত বহন করে।