কালের সাক্ষী জমিদার লক্ষণ সাহার স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি

Date: 2026-06-30
news-banner

মোঃ মাইন উদ্দিন :

নরসিংদী জেলার পলাশ উপজেলার ডাঙ্গা ইউনিয়নের জয়নগর ডাঙ্গাবাজার সংলগ্ন এলাকায় শত বছরেরও বেশি সময় ধরে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে এক প্রাচীন ঐতিহাসিক স্থাপনা- জমিদার লক্ষণ সাহার স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি। স্থানীয়দের কাছে এটি ‘উকিল বাড়ি’ নামেও পরিচিত। সময়ের পরিবর্তনে অনেক কিছু বদলে গেলেও এই বাড়িটি এখনও বহন করে চলেছে এক হারিয়ে যাওয়া জমিদারি যুগের গৌরব, ঐতিহ্য এবং ইতিহাসের অসংখ্য স্মৃতি।

স্থানীয় ইতিহাস, জনশ্রুতি ও প্রবীণদের বর্ণনা থেকে জানা যায়, জমিদার লক্ষণ সাহাই ছিলেন এই জমিদার বংশের মূল গোড়াপত্তনকারী। তবে ঠিক কোন সময়ে এই জমিদার বাড়ি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো লিখিত দলিল পাওয়া যায়নি। অনেকের মতে, এটি মোগল আমলে নির্মিত একটি প্রাচীন স্থাপনা, যা দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলের ইতিহাস ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে আছে।

জানা যায়, লক্ষণ সাহার বংশধররা বৃহত্তর কোনো জমিদারির অধীনস্থ সাব-জমিদার ছিলেন। তবে তাদের জমিদারি ব্যবস্থার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল। প্রচলিত তথ্যানুযায়ী, এই এলাকাটি দেবোত্তর বা ওয়াকফ সম্পত্তির আওতাভুক্ত হওয়ায় তাদের ব্রিটিশ সরকার কিংবা প্রধান জমিদারের কাছে খাজনা প্রদান করতে হতো না। এ কারণেই এ অঞ্চলে তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য।

জমিদার লক্ষণ সাহার ছিল তিন পুত্র- নিকুঞ্জ সাহা, পেরিমোহন সাহা ও বঙ্কু সাহা। ভারত বিভাগের সময় বঙ্কু সাহা ভারতে চলে যান। পরে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের কিছুদিন আগে বড় ছেলে নিকুঞ্জ সাহাও ভারতে পাড়ি জমান। তখন পারিবারিক ভিটেমাটি ও ঐতিহ্যের দায়িত্ব এসে পড়ে পেরিমোহন সাহার ওপর।

পেরিমোহন সাহার একমাত্র পুত্র ছিলেন বৌদ্ধ নারায়ণ সাহা। পরবর্তীকালে বিভিন্ন পারিবারিক ও সামাজিক বাস্তবতায় বৌদ্ধ নারায়ণ সাহা ঐতিহ্যবাহী এই বাড়িটি আহম্মদ আলী উকিলের কাছে বিক্রি করে দেন। আহম্মদ আলী পেশায় আইনজীবী হওয়ায় ধীরে ধীরে বাড়িটি ‘উকিল বাড়ি’ নামে পরিচিতি লাভ করে। তবে স্থানীয় মানুষের কাছে এটি এখনও ‘লক্ষণ সাহার জমিদার বাড়ি’ হিসেবেই অধিক পরিচিত।

স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকেও বাড়িটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। নিপুণ কারুকাজে নির্মিত এই জমিদার বাড়ির মূল ভবনের পাশাপাশি রয়েছে একটি ছোট কারুকার্যমণ্ডিত মন্দির, অর্ধনির্মিত প্রাচীন দালান, পুকুরঘাট এবং জমিদারি আমলের বিভিন্ন নিদর্শন। এসব স্থাপনা অতীতের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় জীবনযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য বহন করে।

কিন্তু সময়ের নির্মম আঘাত এবং যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটির সৌন্দর্য ও ঐতিহ্য। ইতিহাস-ঐতিহ্যপ্রেমী এবং স্থানীয়দের দাবি, প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব বিবেচনায় জমিদার লক্ষণ সাহার এই বাড়িটিকে সংরক্ষণের জন্য দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। কারণ, এমন স্থাপনা শুধু একটি পরিবারের স্মৃতি নয়, এটি একটি জনপদের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের অমূল্য দলিল।

কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা জমিদার লক্ষণ সাহার এই স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি আজও নতুন প্রজন্মকে মনে করিয়ে দেয় হারিয়ে যাওয়া এক জমিদারি যুগের গল্প, ইতিহাসের উত্থান-পতন এবং সময়ের অবিরাম পরিবর্তনের কথা। যথাযথ সংরক্ষণ ও পরিচর্যা পেলে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে বাংলাদেশের ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হয়ে উঠতে পারে।

Leave Your Comments