প্রকাশ : ২৬ জুলাই ২০২৬
সময়: ০৬:৩০ পিএম
বরিশালে ডেঙ্গুর বিস্তার, ঝুঁকিতে ঝালকাঠি ও পিরোজপুর
আবু জাফর বিশ্বাস, বরিশালঃ
বরিশাল বিভাগে ডেঙ্গুর সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে। চলতি বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত সরকারি হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ৩ হাজার ৪৭১। এর মধ্যে শুধু জুলাই মাসের প্রথম ২৫ দিনেই আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৩৫৪ জন। একই সময়ে ডেঙ্গুতে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যার হিসাবে পিরোজপুর ও ঝালকাঠি জেলাকে এখন সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ২৫ জুলাই সকাল ৮টা পর্যন্ত বিভাগের সরকারি হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হওয়া ডেঙ্গু রোগীর মধ্যে পিরোজপুরে ৯৮০ জন এবং ঝালকাঠিতে ৯০২ জন আক্রান্ত হয়েছেন। বরিশাল জেলায় আক্রান্ত ৮৪২ জন, পটুয়াখালীতে ৩৯৫ জন, বরগুনায় ৩৯২ জন এবং ভোলায় ১২৬ জন। বর্তমানে বিভাগের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ২৫৫ জন রোগী। বাকিরা চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরেছেন।
চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া চারজনের মধ্যে সর্বশেষ ২৪ জুলাই রাতে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার ভরপাশা গ্রামের মুনি আক্তার (৩৫)। তিনি তিন দিন আগে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মৃতদের সবাই পিরোজপুর ও ঝালকাঠি জেলার বাসিন্দা।
ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়লেও চিকিৎসা ব্যবস্থায় সীমাবদ্ধতার অভিযোগ রয়েছে। বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং বরিশাল সদর হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য পৃথক ওয়ার্ড নেই। সাধারণ রোগীদের সঙ্গে একই ওয়ার্ডে তাদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
শুক্রবার শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা রোগীর চাপ বেড়েছে। হাসপাতালের অধিকাংশ ডেঙ্গু রোগী পিরোজপুর ও ঝালকাঠি জেলার বাসিন্দা। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসার পর অনেক রোগীকেই উন্নত চিকিৎসার জন্য এই হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে।
আক্রান্ত রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, ডেঙ্গু প্রতিরোধে মাঠপর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে। পিরোজপুরের নেছারাবাদের বাসিন্দা হালিমা খাতুন বলেন, "বছরজুড়ে ডেঙ্গু হলেও আমাদের এলাকায় মশার ওষুধ ছিটাতে খুব একটা দেখি না।"
পিরোজপুরের রেজাউল করিমের ভাষ্য, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বা নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম না থাকায় মানুষ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
ঝালকাঠি পৌর এলাকার বাসিন্দা দেলোয়ার হোসেন বলেন, ডেঙ্গু রোগী বাড়ছে, কিন্তু এলাকায় সচেতনতামূলক প্রচার বা মশক নিধনের কার্যক্রম চোখে পড়ছে না। বৃষ্টির পর জমে থাকা পানি অপসারণেও যথেষ্ট উদ্যোগ নেই।
এ বিষয়ে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. আব্দুল মোনায়েম সাদ বলেন, বর্ষা মৌসুমে প্রতিবছরই ডেঙ্গু রোগী বাড়ে। হাসপাতালের চারটি মেডিসিন ইউনিট বাড়িয়ে ছয়টি করা হয়েছে। পৃথক ওয়ার্ড করা সম্ভব না হলেও প্রতিটি ওয়ার্ডে ডেঙ্গু কর্নার চালু রয়েছে। তিনি বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মানুষের সচেতনতার পাশাপাশি এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোকে আরও সক্রিয় হতে হবে।
বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. লোকমান হাকিম বলেন, বর্ষার বৃষ্টিতে বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকায় এডিস মশার বংশবিস্তার বেড়েছে। বিশেষ করে পিরোজপুর ও ঝালকাঠিতে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি। তিনি বলেন, মশক নিধনের দায়িত্ব স্থানীয় সরকারের। সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসা ব্যবস্থার পাশাপাশি এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত মশক নিধন, পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির সমন্বিত উদ্যোগই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের প্রধান উপায়। বর্ষার বাকি সময়ে এ ধরনের কার্যক্রম জোরদার না হলে বরিশাল বিভাগে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।