প্রকাশ : ২৭ জুলাই ২০২৬
সময়: ১১:৪০ এএম
শিকলছেঁড়া পাগল আর আমাদের সময়ের কিছু মানুষ
মোঃ মাইন উদ্দিন :
কিছু মানুষের আচরণ দেখে মাঝে মাঝে মনে হয়- মানুষের শরীরে বাস করলেও আচরণে তারা যেন শিকলছেঁড়া পাগল! পার্থক্য শুধু একটাই, একসময় পাগলদের হাতে শিকল থাকত, আর এখনকার কিছু মানুষের হাতে আছে মাইক্রোফোন, মোবাইল ফোন!
বলতে হয় ১৯৯৭ সালের একটি ঘটনা। কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার সালুয়া ইউনিয়নের চরকামালপুর গ্রামে ছিলেন একজন সুফি সাধক- ঠুলি মৌলবী নামে পরিচিত। কথিত আছে, তিনি মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষের চিকিৎসা করতেন। তাঁর কাছে চিকিৎসা নিয়ে বহু মানুষ সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন এমন ইতিহাস স্থানীয় মানুষের মুখে আজও শোনা যায়।
সেই সময়ের কথা। একদিন তাঁর চিকিৎসালয় থেকে এক তরুণ পাগল শিকল ছিঁড়ে বেরিয়ে ডুমরাকান্দা বাজারে চলে আসে। তাঁর বয়স আনুমানিক ২০ থেকে ২২ বছর। তখন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায়। সেই তরুণ পাগল বাজারে ঘুরতো আর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের নাম ধরে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করত।
মজার ব্যাপার হলো, বাজারে থাকা সাধারণ মানুষকে সে কিছুই বলত না। এমনকি কোনো টাউট-বাটপার, চাঁদাবাজ, ধান্দাবাজদেরও না। তার রাগ, ক্ষোভ, গালাগালি, সবই ছিল রাজনৈতিক নেতাদের উদ্দেশে। বাজারের কেউ কেউ তার সেই অদ্ভুত আচরণে বিরক্ত না হয়ে বরং কেক-বিস্কুট কিনে দিতেন। স্থানীয় অনেকেরই হয়তো সেই দৃশ্য আজও মনে আছে।
অনেকের মনে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে, ২৯ বছর পর হঠাৎ সেই পাগলটির কথা আমার কেন মনে পড়ল?
হ্যাঁ, আজকাল কিছু মানুষের আচরণে পুরনো পাগলের সেই দৃশ্যের অদ্ভুত মিল খুঁজে পাওয়া যায়। তাদের কথাবার্তা শুনলে মনে হয়, তারাও যেন কোথাও থেকে শিকল ছিঁড়ে বেরিয়ে এসে জনসমক্ষে এসে দাঁড়িয়েছে- তারপর যাকে খুশি তাকে গালাগালি করছে!
তাদের গালাগালির তালিকা ছোট নয়। দেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে বিরোধী দলীয় নেতৃবৃন্দ, আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ নেতৃবৃন্দসহ জাতিসংঘের মহাসচিবও বাদ যাচ্ছে না। যেন পৃথিবীর সব সমস্যার সমাধান একটাই-গালাগালি!
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই পাগলামির ফল কি? গালাগালি দিয়ে কি সমাজ বদলায়? অপমান করে কি যুক্তি প্রতিষ্ঠা করা যায়? কাউকে হেয় করে কি নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করা সম্ভব? না, কখনোই নয়। বরং অশালীনতা অশালীনতাকেই জন্ম দেয়। একজন যখন প্রকাশ্যে সীমা লঙ্ঘন করেন, তখন আরেকজনও সেই সীমা লঙ্ঘনের সাহস পায়। এভাবেই সমাজে যুক্তির জায়গা দখল করে চিৎকার, ভদ্রতার জায়গা নেয় কদর্যতা, আর মতের পার্থক্য রূপ নেয় ব্যক্তিগত আক্রমণে।
পাগলামির পথ কখনোই সহজ নয়। এই পথে হাঁটলে একসময় না একসময় বাস্তবতায় হুঁচট খেতেই হয়। ইতিহাসে যারা সীমাহীন ঔদ্ধত্য, উন্মাদনা আর লাগামহীন আচরণকে শক্তি ভেবেছে, সময় তাদের প্রত্যেককেই কোনো না কোনোভাবে জবাব দিয়েছে।
তাই গালাগালি নয়- যুক্তি দিন। অপমান নয়-প্রতিবাদ করুন। মতের বিরোধিতা করুন, কিন্তু মানুষকে অপমান করার সংস্কৃতি তৈরি করবেন না।
কারণ আজ আপনি যাকে গালি দিচ্ছেন, কাল সেই গালির সংস্কৃতিই আপনার দরজায় কড়া নাড়তে পারে।
মনে রাখবেন- শিকল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসা সহজ, কিন্তু শিকলহীন অবস্থায় নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখা- সেটাই আসল সভ্যতা।