প্রকাশ : ২৭ জুলাই ২০২৬
সময়: ১০:১৫ পিএম
আওয়ামী নেতার ডিও লেটারে পদায়ন ও নিয়োগ বাণিজ্য, আলোচনায় ফায়ার সার্ভিসের আতাহার
সবুর খান :
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের প্রশাসনিক অনিয়ম, কেনাকাটায় কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি এবং নিয়োগ বাণিজ্য নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের জেরে এক সাংবাদিককে গ্রেপ্তারের ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় এসেছেন অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) মো. শহীদ আতাহার হোসেন। ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁর অতীত পদায়ন, রাজনৈতিক সুপারিশ এবং বিভিন্ন চাঞ্চল্যকর দুর্নীতির অভিযোগ সামনে এসেছে।
অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ ‘পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ)’ পদে বসতে তৎকালীন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজমের আধাসরকারি পত্র বা ডিও (Demiofficial) লেটার নিয়েছিলেন মো. শহীদ আতাহার হোসেন।
প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ২০২২ সালের ১২ এপ্রিল তৎকালীন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের কাছে পাঠানো ওই পত্রে মির্জা আজম আতাহার হোসেনকে তাঁর নিজ জেলার বাসিন্দা এবং "মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের একজন নিবেদিত কর্মকর্তা" হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে ফায়ার সার্ভিসের ১১টি মডার্ন প্রকল্পের পরিচালক পদে থাকা আতাহার হোসেনকে শূন্য থাকা পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) পদে পদায়নের জন্য জোরালো সুপারিশ জানান তিনি। রাজনৈতিক প্রভাব ও এই সুপারিশের মাধ্যমেই তিনি ওই লোভনীয় পদ বাগিয়ে নেন বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।
সম্প্রতি ফায়ার সার্ভিসের প্রশাসনিক অনিয়ম, কেনাকাটায় দুর্নীতি এবং কতিপয় কর্মকর্তার অনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে তথ্য-উপাত্তভিত্তিক একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিবেদন প্রকাশের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অনুসন্ধানী সাংবাদিক হাফিজুর রহমান শফিকের বিরুদ্ধে সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা দায়ের করা হয়।
এর পরপরই অধিদপ্তরের একটি প্রভাবশালী মহলের তৎপরতায় শাহবাগ থানার পুলিশ সাংবাদিক শফিককে মগবাজার এলাকা থেকে আটক করে গ্রেপ্তার দেখায়। সংবাদ প্রকাশের জেরে কোনো নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়াই একজন সাংবাদিককে এভাবে গ্রেপ্তারের ঘটনায় গণমাধ্যম অঙ্গন, মানবাধিকারকর্মী ও সুশীল সমাজে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। সাংবাদিক সমাজের মতে, এই ধরনের প্রশাসনিক পদক্ষেপ স্বাধীন সাংবাদিকতা ও বাকস্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্য একটি অশনিসংকেত।
পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) শহীদ আতাহার হোসেনের বিরুদ্ধে ফায়ার সার্ভিসের বিভিন্ন পদে কোটি কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্যের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, নিয়োগ কমিটির সভাপতি হিসেবে নিজের প্রশাসনিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে তিনি একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন।
প্রতিবেদনে সিরাজগঞ্জের এক ফায়ার স্টেশনের চালকের মর্মান্তিক মৃত্যুর বিষয়টি উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, চাকরিতে নিয়োগের আশ্বাস দিয়ে ওই চালকের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রার্থীর কাছ থেকে প্রায় ৮৫ লাখ টাকা তোলা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে কারও চাকরি না হওয়ায় পাওনাদারদের ক্রমাগত চাপ ও মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে ওই চালক আত্মহত্যা করতে বাধ্য হন।
নিয়োগ বাণিজ্য ছাড়াও অধিদপ্তরের কতিপয় কর্মকর্তা ও পছন্দের ঠিকাদারদের নিয়ে গঠিত সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কেনাকাটায় কোটি কোটি টাকা অপচয় এবং হরিলুটের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এর পাশাপাশি সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের লাইসেন্স ফি বহুগুণ বাড়িয়ে জনগণের পকেট কাটার অভিযোগও উঠে এসেছে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে।
রাজনৈতিক প্রভাবে পদ দখল, কেনাকাটায় সিন্ডিকেট রাজত্ব এবং সাংবাদিক গ্রেপ্তারের মতো ঘটনা সামনে আসার পর ফায়ার সার্ভিস অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও মো. শহীদ আতাহার হোসেনের ভূমিকা নিয়ে চরম বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।