নকশা নাকি টোল-ফাঁদ নিচে অন্তহীন দুর্ভোগ, ওপরে ওরিয়নের সীমাহীন মুনাফা

মোঃ বশির আহমেদ সানি:

‎জনগণের স্বস্তি নাকি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পকেট ভারী—কাদের স্বার্থে তৈরি হয়েছিল রাজধানীর যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান ফ্লাইওভার (সাবেক মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভার)? চার লেন বিশিষ্ট এই উড়ালসড়কের নিচে এখন প্রতিদিন লাখো মানুষের দীর্ঘশ্বাস আর অন্তহীন যানজটের ভোগান্তি। অভিযোগ উঠেছে, প্রকৌশলগত কোনো প্রয়োজন ছাড়াই ফ্লাইওভারের প্রায় প্রতিটি পিলার অস্বাভাবিক চওড়া করে তৈরি করা হয়েছে। মূল উদ্দেশ্য—নিচের সড়ক সংকুচিত করে কৃত্রিম যানজট তৈরি করা, যাতে চালকেরা বাধ্য হয়ে ওপরে ওঠেন আর তার বদৌলতে হবে টোল বাণিজ্য।
‎পরিকল্পনা কমিশনের কারিগরি বিশেষজ্ঞ এবং নগর পরিকল্পনাবিদদের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে এই ভয়াবহ 'পরিকল্পিত নকশা-জালিয়াতি'র বিষয়টি সামনে এসেছে।
‎যাত্রাবাড়ী-সায়দাবাদে পিলার জটে থমকে আছে ঢাকার মূল প্রবেশপত্র। হানিফ ফ্লাইওভারের নিচে সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ দেখা যায় ঢাকার অন্যতম প্রবেশদ্বার যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা এবং সায়দাবাদ বাস টার্মিনাল এলাকায়। এই করিডোর দিয়ে দেশের ৪২ জেলা থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার দূরপাল্লার বাস ও পণ্যবাহী ট্রাক রাজধানীতে প্রবেশ করে। কিন্তু ফ্লাইওভারের দানবীয় পিলারগুলো এই গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোকে আক্ষরিক অর্থেই গিলে খেয়েছে।
‎সায়দাবাদ জনপথ মোড় থেকে টার্মিনাল পর্যন্ত অংশে একে তো পিলারের কারণে রাস্তা সরু, তার ওপর পিলারের আড়ালে তৈরি হয়েছে অবৈধ বাস স্ট্যান্ড ও সিএনজি-লেগুনা স্ট্যান্ড। পিলারের বিশাল দানবীয় আকৃতির কারণে পেছনের যানবাহন বা পথচারী পারাপারও দূর থেকে চোখে পড়ে না, যা প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ও যানজট বাড়াচ্ছে।
‎যাত্রাবাড়ী মোড়ে ফ্লাইওভারের ওঠানামার র‍্যাম্প এবং বিশাল চওড়া পিলারের কারণে নিচের মূল সড়কটি সরু গলিতে পরিণত হয়েছে। চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগ থেকে আসা গাড়িগুলো নিচে এক চুল নড়ার জায়গা পায় না। কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট এখানে নিত্যদিনের চিত্র।
‎সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, ফ্লাইওভারের  নিচের অংশের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। সামান্য বৃষ্টিতেই সেখানে জলাবদ্ধতা এবং পরে কাঁদার সৃষ্টি হয়। সড়কটি তুলনামূলক সরু ও অপর্যাপ্ত আলোর কারণে পথচারীদের চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়, আর সেই সুযোগে ফ্লাইওভারের পিলারের নিচে যত্রতত্র মলমূত্র ত্যাগ করা হয়। এছাড়া মাদকসেবী ও মাদক কারবারিদের আনাগোনা, ছিনতাইকারীদের উৎপাত এবং ফ্লাইওভারের নিচে গড়ে ওঠা অন্তত সাত থেকে আটটি ময়লার ভাগাড় এলাকাটিকে সাধারণ মানুষের জন্য অনিরাপদ ও অস্বাস্থ্যকর করে তুলেছে। ফলে একান্ত প্রয়োজন ছাড়া কেউ এই সড়ক ব্যবহার করতে চান না। স্থানীয়দের আশঙ্কা, এ অবস্থা চলতে থাকলে একসময় ফ্লাইওভারের নিচের সড়ক কার্যত অকেজো ও যানবাহনশূন্য হয়ে পড়বে।
‎স্থানীয় বাসিন্দা মোঃ আলমগীর হোসেন বার্তা বিচিত্রাকে বলেন,
‎"এই ফ্লাইওভার আমাগো কোনো উপকারেতো আইলোই না, উল্টা আমগো গলার কাঁটা হইয়া দাঁড়াইছে। যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা আর সায়েদাবাদ ব্রিজের অবস্থা দেখলেই বুঝবেন। এইখানে রাস্তা পার হইতে গেলে জান হাতে নিয়া পার হইতে হয়। কোন দিক থেইকা গাড়ি আইবো, সেইডা আন্দাজ করাও মুশকিল। ছোট-বড় অ্যাক্সিডেন্ট তো প্রায় রোজই হয়। এত দুর্ঘটনা দেখতে দেখতে আমরাও অভ্যস্ত, ট্রাফিক পুলিশও অভ্যস্ত হইয়া গেছে। ফ্লাইওভারের পিলারের বাউন্ডারি ওয়াল হেরোইঞ্চি আর গাঁজুট্টিগো লাইগা একেবারে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হইয়া গেছে, চুরি ছিনতাই এইহানে প্রতিদিনের ঘটনা।"
‎স্থানীয় আরেক বাসিন্দা সৌরভ বলেন,
‎"সায়েদাবাদ ব্রিজের পাশেই যাত্রাবাড়ী আইডিয়াল হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ। ছোট ছোট পোলাপান রোজ স্কুলে যাইতে আর আইতে গিয়া রাস্তা পার হয়, আর প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হয়। এইটার মূল কারণ এই ফ্লাইওভারের ভুল ডিজাইন আর নির্মাণ। ফ্লাইওভার বানাইয়া সায়েদাবাদ আর যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তায় কোনো ফুটওভার ব্রিজ দেয় নাই। এখন যে অবস্থা, নতুন কইরা ফুটওভার ব্রিজ দেওয়াও কঠিন। এই ফ্লাইওভার আমাগো লাইগা আশীর্বাদ না, একটা অভিশাপ। নিচে রাস্তা চিকন কইরা রাখছে, তাই ২৪ ঘণ্টাই যানজট। আর রাস্তা পার হওয়া মানে জানটা হাতে নিয়া নামা।"
‎সায়েদাবাদ রুটের এক বাস চালক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন "নিচের রাস্তা দিয়া গেলে যাত্রাবাড়ী পার হইতেই দেড়-দুই ঘণ্টা লাগে। জ্যামের ঠেলায় ওস্তাদ বাধ্য হইয়া ওপরে টোল দিয়া গাড়ি তোলে। আমাদের পকেট কাটার লাইগাই নিচের রাস্তাডা এমনে চিপা বানাইছে।"
‎সংশ্লিষ্ট সূত্র ও প্রকৌশলীদের মতে, আধুনিক উড়ালসড়ক নির্মাণে এখন ন্যূনতম জায়গা ব্যবহার করে সর্বোচ্চ কার্যকারিতা নিশ্চিত করার প্রযুক্তি বিশ্বজুড়েই স্বীকৃত। অথচ হানিফ ফ্লাইওভারের ক্ষেত্রে ঘটেছে ঠিক উল্টোটা। ফ্লাইওভারের প্রতিটি পিলারের প্রস্থ প্রায় ২৪ থেকে ২৬ ফুট। বিশেষজ্ঞদের মতে প্রকৌশলগত দিক থেকে একটি পিলারের জন্য এত বিশাল জায়গার কোনো যৌক্তিকতা নেই।
‎"নিচের রাস্তা বন্ধ করে ওপরে গাড়ি তোলার এই কৌশল স্পষ্টতই জনস্বার্থবিরোধী। কম জায়গায় পিলার করার প্রযুক্তি থাকার পরও কেন সড়ক গিলে খাওয়া এই নকশা অনুমোদন পেল, তা খতিয়ে দেখা দরকার।" — নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন নগর পরিবহন বিশেষজ্ঞ।
‎ভুক্তভোগীদের ক্ষোভ স্থানীয় বাসিন্দা ও নিয়মিত যাতায়াতকারী চালকদের অভিযোগ, এটি কোনো সাধারণ ভুল নয়, বরং নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ওরিয়ন গ্রুপের (Orion Group) একটি সুদূরপ্রসারী ব্যবসায়িক কৌশল বা 'টোল-ফাঁদ'। নিচের সড়কে যান চলাচল সীমিত ও দুর্বিষহ করে তুলে চালকদের উড়ালসড়ক ব্যবহারে বাধ্য করাই ছিল মূল লক্ষ্য। প্রতিদিন হাজার হাজার চালক নিচের অন্তহীন জটলা থেকে বাঁচতে পকেটের টাকা খসিয়ে ফ্লাইওভার ব্যবহার করছেন, যার সরাসরি সুবিধা পাচ্ছে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার অতিরিক্ত টোল উঠছে ওরিয়ন গ্রুপের তহবিলে, আর নিচে যাত্রাবাড়ী-সায়েদাবাদের সাধারণ মানুষ পুড়ছে সীমাহীন ভোগান্তির আগুনে।
‎প্রকল্পটির নকশা প্রণয়ন, অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং নির্মাণকালীন সিদ্ধান্তগুলোর পেছনে কোনো আর্থিক অনিয়ম বা বিশেষ সুবিধা দেওয়ার চুক্তি ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সাধারণ জনগণের মাঝে।
‎স্থানীয় বাসিন্দা এবং জনগণের দাবি একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করতে হবে। ভবিষ্যতে যেন কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মুনাফার জন্য রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও জনস্বার্থকে এভাবে বলি দেওয়া না হয়, আইনি কাঠামোর মাধ্যমে তার স্থায়ী নিশ্চয়তা নিশ্চিত করতে হবে। এর পাশাপাশি ঢাকার এই  প্রবেশদ্বারকে সচল করতে এবং কৃত্রিম যানজটের সংকট থেকে নগরবাসীকে মুক্তি দিতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ি ফ্লাইওভারের নিচের সড়ক উদ্ধার এবং উপরে টোল আদায় বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি।