প্রকাশ : ২৮ জুলাই ২০২৬
সময়: ১১:২৪ এএম
ব্যক্তিস্বাধীনতার কাঠগড়ায় একজন শিক্ষিকা
মোঃ মাইন উদ্দিন :
একজন শিক্ষক কি শিক্ষক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার ব্যক্তিগত জীবনও সমাজের সম্পত্তিতে পরিণত হয়ে যায়? তিনি কি আর হাসতে পারবেন না, কাঁদতে পারবেন না, নাচতে পারবেন না, গাইতে পারবেন না, আনন্দ প্রকাশ করতে পারবেন না? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাম্প্রতিক একটি ঘটনাকে ঘিরে এসব প্রশ্ন সামনে এসেছে।
সিলেট জেলার সেরা প্রধান শিক্ষিকা সম্মাননা প্রাপ্ত বিউটি রানী'র একটি ব্যক্তিগত নাচের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তেই সেটি পরিণত হয় ট্রোল, বিদ্রূপ, কটূক্তি ও চরিত্রহননের উপকরণে। কেউ তার শিক্ষকতা নয়, তার সততা নয়, তার কর্মনিষ্ঠা নয়, ব্যক্তিগত একটি মুহূর্তকে বিচারকের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। এ প্রবণতা শুধু একজন শিক্ষকের প্রতি অবিচার নয়, এটি আমাদের সামাজিক বিবেকেরও পরাজয়।
একজন শিক্ষকের পরিচয় তার শ্রেণিকক্ষে, তার পাঠদানে, তার মানবিকতায় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গঠনের অবদানে। তিনি অবসরে কি গান গাইবেন, গান শুনবেন, কোথায় বেড়াতে যাবেন, কিংবা আনন্দের মুহূর্তে নাচবেন কি না, এসব হলো তার ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অংশ। রাষ্ট্রের আইন ভঙ্গ না করে, অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন না করে একজন মানুষ কিভাবে নিজের জীবন উপভোগ করবেন, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কেবল তারই।
দুঃখজনক হলেও সত্য, আমরা ধীরে ধীরে এমন এক ডিজিটাল সমাজে প্রবেশ করছি, যেখানে মানুষের সাফল্যের চেয়ে তার ব্যক্তিগত মুহূর্ত বেশি আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠছে। একটি ভিডিওকে বিকৃতভাবে ছড়িয়ে দিয়ে কাউকে অপমান করা যেন বিনোদনের নতুন মাধ্যম। অথচ এই ট্রোলের আড়ালে কতটা মানসিক যন্ত্রণা, সামাজিক অপমান এবং পারিবারিক চাপ লুকিয়ে থাকে, তা নিয়ে খুব কম মানুষই ভাবেন।
সমালোচনা অবশ্যই গণতান্ত্রিক সমাজের একটি অপরিহার্য উপাদান। কিন্তু সমালোচনা আর চরিত্রহনন এক জিনিস নয়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কখনোই অন্যের মর্যাদা নষ্ট করার লাইসেন্স হতে পারে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যদি ঘৃণা, বিদ্বেষ ও অপমানের প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়, তাহলে সেই সমাজ সভ্যতার পথে নয়, বরং অসহিষ্ণুতার অন্ধকারে তলিয়ে যাবে।
বিশেষভাবে উদ্বেগের বিষয় হলো, একজন নারী যখন নিজের স্বাভাবিক আনন্দ প্রকাশ করেন, তখন তাকে পুরুষের তুলনায় অনেক বেশি সামাজিক বিচারের মুখোমুখি হতে হয়। এই দ্বৈত মানসিকতা আমাদের সংস্কৃতির নয়, বরং সংকীর্ণ চিন্তার প্রতিফলন। নারী কিংবা পুরুষ, উভয়ের জন্যই ব্যক্তিগত স্বাধীনতার মানদণ্ড সমান হওয়া উচিত।
আমরা ভুলে যাই, শিক্ষকও মানুষ। তারও পরিবার আছে, বন্ধু আছে, আনন্দ-বেদনা আছে। তিনি সারাক্ষণ পাঠ্যবইয়ের চরিত্র হয়ে বেঁচে থাকবেন এমন প্রত্যাশা যেমন অযৌক্তিক, তেমনি অমানবিকও।
আজ প্রয়োজন অনলাইন শালীনতার নতুন সংস্কৃতি গড়ে তোলা। প্রয়োজন এমন একটি সমাজ, যেখানে মানুষকে তার কাজ দিয়ে মূল্যায়ন করা হবে, ব্যক্তিগত আনন্দ দিয়ে নয়, যেখানে ভিন্ন রুচিকে সম্মান করা হবে, উপহাস নয়, যেখানে ট্রোল নয়, মানবিকতাই হবে সবচেয়ে বড় পরিচয়।
বিউটি রানীর ঘটনাটি একজন ব্যক্তির নয়, এটি আমাদের ডিজিটাল সমাজের আয়না। এই আয়নায় আমরা যদি নিজেদের অসুন্দর মুখ দেখতে না চাই, তবে এখনই ঘৃণা, ট্রোল ও চরিত্রহননের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে কথা বলতে হবে।
আসুন, আমরা একজন শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষা করি। ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে সম্মান করি। কারণ আজ যদি অন্যের স্বাধীনতা পদদলিত হয়, কাল সেই আঘাত আমাদের দরজাতেও কড়া নাড়বে।
তাই বলবো, অনলাইন হয়রানি বন্ধ হোক। ব্যক্তিস্বাধীনতা, মর্যাদা এবং মানবিকতার জয় হোক।