প্রকাশ : ২৯ জুলাই ২০২৬
সময়: ০১:২৮ পিএম
গণতন্ত্রের ভাষা হোক সংযমের, রাজনীতির পথ হোক সম্প্রীতির
মোঃ মাইন উদ্দিন :
বাংলাদেশের রাজনীতি আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছে, যেখানে প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার চেয়ে তাকে শত্রু হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রবণতাই যেন বেশি দৃশ্যমান। রাজনৈতিক মতপার্থক্য গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অনুষঙ্গ হলেও সেই মতপার্থক্য যখন বিদ্বেষ, কটূক্তি কিংবা সহিংসতায় রূপ নেয়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু একটি দল নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো রাজনৈতিক সংস্কৃতি।
সম্প্রতি কিশোরগঞ্জে এনপিপির জুলাই পদযাত্রা কর্মসূচি ঘিরে যে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে, তা এই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে। কর্মসূচি শেষে দলটির কয়েকজন বক্তার বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তি ও দলকে নিয়ে তাঁদের মন্তব্য অনেকের কাছে শালীনতা ও রাজনৈতিক সৌজন্যের সীমা অতিক্রম করেছে বলে প্রতীয়মান হয়েছে। এর পরপরই সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে।
সমালোচনা গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করলে এর সমালোচনা হবে- এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, রাজনৈতিক বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া কি কখনো সহিংস হতে পারে?
কিশোরগঞ্জের একদিন পর হবিগঞ্জে এনপিপির পদযাত্রা শেষে হামলার যে ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ উঠেছে, তা উদ্বেগজনক। এনপিপির অভিযোগ অনুযায়ী, তাদের নেতাকর্মী ও মিডিয়া টিমের ওপর হামলা চালানো হয়েছে এবং এতে অনেকে আহত হয়েছেন। তবে এই ঘটনার প্রকৃত সত্য তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।
কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট, নতুন রাজনৈতিক দল হিসেবে এনসিপির দায়িত্ব রয়েছে নিজেদের ভাষা, আচরণ ও রাজনৈতিক কৌশল সম্পর্কে সচেতন থাকার। কারণ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-আন্দোলনের সময় যে জনসমর্থন ও আবেগ সৃষ্টি হয়েছিল, তা ছিল বহুমাত্রিক। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সাধারণ শিক্ষার্থী এবং সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে সেই আন্দোলন শক্তিশালী হয়েছিল। তবে আন্দোলনের আবেগ চিরস্থায়ী নয়। সময়ের সঙ্গে মানুষের প্রত্যাশা বদলায়, রাজনৈতিক বাস্তবতাও পরিবর্তিত হয়। তখন দায়িত্বশীলতা, সংযম এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতিই হয়ে ওঠে জনআস্থা ধরে রাখার প্রধান শর্ত।
মনে রাখা প্রয়োজন, প্রতিপক্ষকে গালাগালি আর ভয় দেখিয়ে রাজনৈতিক অবস্থান সুসংহত করা যায় না। এতে সাময়িক সুবিধা মিললেও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হয় গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও রাজনৈতিক সহাবস্থানের সংস্কৃতি।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পারস্পরিক সহনশীলতা, রাজনৈতিক সৌজন্য এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল মনোভাব। মতের ভিন্নতা থাকবে, তর্ক-বিতর্ক থাকবে, সমালোচনা থাকবে- এসবই গণতন্ত্রের প্রাণ। কিন্তু সেই ভিন্নমত যেন কখনো সহিংসতার কারণ না হয়।
রাজনীতি যদি মানুষের নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তবে সেই রাজনীতির উদ্দেশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। তাই সময়ের দাবি একটাই- উত্তেজনামূলক বক্তব্য নয়- প্রয়োজন সংযম, প্রতিহিংসা নয়- প্রয়োজন সহাবস্থান, পাগলামি নয়- প্রয়োজন সহনশীলতা ও সম্প্রীতির রাজনীতি।